২৫ জুন নতুন দাম কার্যকর

উর্ধ্বমুখী বাজারে শুধু কোরবানির চামড়ার দাম কম

গোলাম রাব্বানী

জুন ২০, ২০২৩, ০৯:১৮ পিএম

উর্ধ্বমুখী বাজারে শুধু কোরবানির চামড়ার দাম কম

দুই বছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। কিন্তু এই দাম বাড়লেও কোরবানির পশুর চামড়ায় এই প্রভাব পড়েনি। গত ১০ বছরের তুলনায় উল্টো কাঁচা চামড়ার দাম কমেছে ৬০ শতাংশ আর বেড়েছে চামড়াজাত পণ্যের। আগামী ২৫ জুন চামড়ার দাম ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধির প্রস্তাবনাও দিচ্ছে তারা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন,  গত বছরের চেয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য। সে হিসাবে হয়তো এবার গরুর চামড়ার মূল্য প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা হতে পারে। আর খাসির চামড়ার মূল্য হতে পারে ২০ থেকে ২২ টাকা।

তবে চামড়ার ব্যবসা ভাল থাকলেও কাঁচা চামড়ার মূল্যের দাম এত কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দেশ থেকে সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো পণ্য কিনে না। চিন আমাদের বড় ক্রেতা। তাই তারা দাম বেশি দিচ্ছে না। সাভারের সিইটিপি এখনও পুরোপুরি শোধন না করায় পরিবেশগত কারনে এমন হচ্ছে।

চামড়াপ্রতি লাভে আকাশ পাতাল পার্থক্য

ট্যানারি একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছে একটি গরুর চামড়া থেকে ৫০ হাজার টাকার পণ্য প্রস্তুত করা হয়। আর সেই চামড়াটির সর্বোচ্চ মূল্য থাকে ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা। অর্থাৎ গরুর আনুমানিক বাজার মূল্য ১ লাখ টাকা এবং চামড়ার আনুমানিক সাইজ ২২ বর্গফুট। এমন কোরবানির লবণবিহীন কাঁচা চামড়া কেনার মূল্য ৮৫০ টাকা। অন্যান্য প্রসেসিংয়ে ব্যয় হয় ১৯০০ টাকা। একটি পাকা চামড়ার মূল্য হয় ২৭৫০ টাকা। স্থানীয় বাজারে বা বিদেশি রফতানিযোগ্য ১০ জোড়া উন্নত মানের জুতা আনুমানিক মূল্য ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব। অর্থাৎ একজোড়া জুতা ৫ হাজার টাকা হয়। আর একটি পুরো চামড়ার দাম ৮৫০ টাকা।

শুধু কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কম

দেশে সবকিছুর দাম বাড়লেও কেবল কুরবানির পশুর চামড়ার দাম কমছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে দেশে কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য অনেক খানি কমেছে। দেখা যাচ্ছে গত ১০ বছরে প্রতি বর্গফুটে গরুর চামড়ার মূল্য কমেছে ৩৮ টাকা, খাসির চামড়ার মূল্য কমেছে ৩২ থেকে ৩৫ টাকা এবং বকরির চামড়ার মূল্য কমেছে ২৮ থেকে ৩১ টাকা।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ১০ বছর আগে ২০১৩ সালেও ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৮৫-৯০ টাকা, আর ঢাকার বাইরে ৭৫-৮০ টাকায় কেনা হয়। সে বছর খাসির চামড়ার দর প্রতি বর্গফুট ৫০-৫৫ টাকা এবং বকরির চামড়ার ৪০-৪৫ টাকা নির্ধারণ হয়। এ ছাড়া মহিষের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ৪০-৪৫ টাকা। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে গরুর চামড়ার মূল্য কমিয়ে ধরা হয় ৭০-৭৫ টাকা, খাসির চামড়া ৪০-৪৫ টাকা এবং বকরির চামড়ার মূল্য ছিল ৩৫-৪০ টাকা।

বছরে ১৩ হাজার কোটি টাকার চামড়া ও চামড়া পণ্য রফতানি

ট্যানারি মালিকরা কুরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য না দিলেও তারা ঠিকই চড়া মূল্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করছে। বছরে তারা ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার এ পণ্য রফতানি করছে।  রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১১ মাসে দেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রফতানি আয় হয়েছে ১২ হাজার ৯৮ কোটি ৫৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই ১১ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানিতেও বেশ ভালো প্রবৃদ্ধিও আছে। জানা যায়, চলতি অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১১ মাসে (জুলাই-মে) রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ হাজার ৩০১ কোটি ডলারের। এর বিপরীতে রফতানি হয়েছে ১ হাজার ১২০ কোটি ডলারের। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই ১১ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি কম হয়েছে ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হলেও এই ১১ মাসে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ। এ সময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ১১৫ কোটি ডলার। এক ডলার ১০৮ টাকার হিসাবে আয় এসেছে ১২ হাজার ৯৮ কোটি ৫৯ লাখ ২০ হাজার টাকার।

লবণের দাম নিয়ে শঙ্কা

চলতি অর্থবছরে দেশে ৬১ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হলেও বাজারে এর প্রভাব নেই। বরং উল্টো লবণের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৩শ টাকা। আর কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। কোরবানির আগে হঠাৎ করে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ার পেছনে সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়ত পর্যন্ত পৌঁছার আগে লবণের দাম পড়ত কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ১৬ টাকা। সেই লবণ এখন ১৯-২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। লবণ সিন্ডিকেটে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, মৌসুম শুরুর আগেই লবণের দাম বেড়ে যাওয়া চামড়া ব্যবসায়ীদের চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। রীতিমতো ব্যবসায়ীরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। হঠাৎ করে বস্তাপ্রতি ৩শ টাকা বেড়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। তিনি বলেন, এভাবে দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়বে কাঁচা চামড়ার ওপর।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার টন, যা গত ৬১ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া, চাষযোগ্য জমি এবং চাষির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপুল পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। তবে উৎপাদন রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেও তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ হবে না। কারণ বর্তমানে দেশে লবণের চাহিদা ২৩ লাখ ৩৫ হাজার টন।


 

Link copied!