জুন ৮, ২০২৩, ০৮:৪৭ পিএম
অর্থবছর ২০২৩-২৪ এর বাজেটে শেয়ারবাজার উপেক্ষিত হওয়ায় এর সাথে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজ ও বিনিয়োগকারী সকলেই হতাশ। বাজেট অধিবেশন চলবে ২৬ জুন পর্যন্ত। এরই মধ্যে শেষ পর্যন্ত কিছু দাবী-দাওয়া পূরণে বাজারসংশ্লিষ্ট সকলেই সরকারের অর্থমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি চায়।
`ফ্লোর প্রাইস` এর শেকলে আটকে থাকা শেয়ারবাজার এক অজানা উদ্দীপনায় হঠাৎ করেই বাজেটের আগে পরে লেনদেন একটু বেড়ে যায়। কিন্ত আবারও লেনদেনের উপর করারোপের গুজবে বাজার পড়েও যায়। ফলে, বাজেটের পরবর্তী সপ্তাহে সিঙ্গেল কর্মদিবসে লেনদেন ১ হাজার ৩শ কোটি টাকার ঘরে পৌছালেও আবার তা পড়ে ৮শ কোটির ঘরে নেমে আসে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুজব আপাতত কেটে যাওয়ায় আবারও বাজার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। লেনদেন বেড়ে আবারও হাজার কোটির ঘর ছাড়িয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান হাফিজ মো. হাসান বাবু বলেছেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্হায় পুঁজি সংগ্রহে শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বাজেটে উপেক্ষিত হয়েছে চরমভাবে।
বেসরকারী গবেষণা সংস্হা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে শেয়ারবাজার নিয়ে বাজেটে উৎসাহমূলক কিছু থাকা উচিত ছিলো।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য সাত লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট উত্থাপন করেন। সেখানে পুঁজিবাজার নিয়ে নতুন কোনো উদ্যোগ না ছিলো না। বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজার নিয়ে বাজেটে কিছু থাকার বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেন নি।
এদিকে, দেশের শেয়ারবাজারের সাথে যুক্ত প্রায় ১৯ লাখ বিনিয়োগকারী। এছাড়াও রয়েছে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের প্রায় ৫০ হাজার নিয়মিত কর্মচারী।
ডিএসই চেয়ারমান হাফিজ মো. হাসান বাবু সাংবাদিকদের বলেছেন, শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় আছে। ফ্লোর প্রাইসের কারনে মাসের পর মাস অনেক বিও আ্যকাউন্টে লেনদেন হয়না। ফলে গুটিকয়েক বিনিয়োগকারীর এ্যাকাউন্টে লেনদেনের কমিশন নিয়ে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, এমন বাস্তবতায় আমরা মনে করি বিনিয়োগকারীদের `আস্থাহীন` এই পুঁজিবাজারে সামান্য সদয় দৃষ্টি দিলে ঘুরে দাঁড়াবে এই বাজার। আর এবারের বাজেট জনগণের বাজেটে পরিণত হবে।
তিনি জানান, ছয়টি দাবী চলতি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিলো।
এগুলোর মধ্যে আছে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে সরকারে পক্ষ থেকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর হারের ব্যবধান ১০ শতাংশ করা।
তিনি জানান, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানি অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির চেয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট কম কর দেয়। তবে ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টেলিকম, টোবাকো খাত এর বাহিরে। কর হারের এই ব্যবধান বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হলে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হবে বলে তিনি দাবী করেন।
অন্য দাবিগুলো হলো: বিনিয়োগকারীদের দেওয়া লভ্যাংশের ওপর দ্বৈত কর প্রত্যাহার করে বন্ডের ওপর কেটে রাখা অগ্রিম করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা; শেয়ার লেনদেন কর শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ০১৫ শতাংশ করা; এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর ব্যবধান ১০ শতাংশ করা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে ১০ শতাংশ করা।
এর আগে `দ্বৈত কর` ব্যবস্হার অবসান ও বিদেশী ও বহুজাতিক কোম্পানীর জন্য `করছাড়` চেয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-কে চিঠি দিয়ে এ বিষয়টি আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করারও দাবী জানায়।
চিঠিতে বিএসইসি জানায়, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মুনাফা থেকে ২ বার উৎসে কর আদায় করা হচ্ছে। একবার কোম্পানির কাছ থেকে আরেকবার বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে।
বিএসইসি দাবী করে এ `দ্বৈত কর` ব্যবস্হার অবসান করা হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো আরও বেশী লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের দিতে পারবে। আর এতে করে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এছাড়া, বর্তমানে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্জিত আয় ও বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড এর ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্জিত আয় করমুক্ত রয়েছে। বিএসইসির চিঠিতে এক্ষেত্রে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয়কে করমুক্ত হিসেবে বিবেচনা করতে অনুরোধ করা হয়।
বাজেটে অন্তর্ভূক্তির জন্য বিএসইসি`র চিঠিতে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন উত্তোলনে উৎসাহিত করতে দেশি, বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির জন্যও কর–সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন এসএমই খাতের কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসলে বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠবে। একইসাথে মূলধনও বাড়বে।
তারা জানান, বাংলাদেশে এসএমই মার্কেটের মূলধনের আকার ১২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন টাকা। আর এ খাতের মাত্র ১৬টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। পাশের দেশ ভারতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ৯৭ শতাংশই এসএমই খাতের।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বাড়াতে পারলে অর্থায়নে ব্যাংক নির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনি খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে আসবে।