আগস্ট ২৯, ২০২৫, ০৪:৪৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনীতিকে আরও উন্মুক্ত করে দিতে হবে। পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তরুণসহ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মেনে নেবে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বার্থেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।
শুক্রবার, ২৯ আগস্ট সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৫-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তারা এ কথাগুলো বলেছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালেটিকস (দায়রা) এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে। দুই দিনের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘বাংলাদেশ অ্যাট ক্রস রোডস: রিথিংকিং পলিটিকস, ইকোনমিকস, জিওপলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজি’। খবর প্রথম আলো।
সকালে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন শুরু হয়। জুলাই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর দায়রার পক্ষ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।
স্বাগত বক্তৃতায় সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার মধ্য দিয়ে যেসব সংগঠন সৃষ্টি হয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম দায়রা। অভ্যুত্থানের এক বছর পর অনেকেই নানা বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন। কারও হতাশা রাজনৈতিক দল নিয়ে। কারও হতাশা অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন নিয়ে। কেউ কেউ হতাশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। কারও হতাশা সংস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে। কেউ কেউ হতাশ হত্যাকারীদের বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে।
হতাশা ছাপিয়ে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের অর্জনের ওপর জোর দেন মুশতাক খান। তিনি বলেন, হতাশা যে আছে, এটা ঠিক। তবে তিনি জোর দিতে চান, বাংলাদেশের ২০২৪ সালের বিরাট অর্জনের ওপর। নিরস্ত্র জনগণের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান এই অঞ্চলের অন্যতম হিংস্র, দমনমূলক, রক্তপিপাসু সরকারকে হটিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ একটি দেশ, যেখানে নতুন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বারবার স্বৈরাচারী সরকারকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী সরকারের যে কাঠামো ছিল, তাতে পরিবর্তন আসেনি বলে উল্লেখ করেন মুশতাক খান। তিনি বলেন, এটা হতাশার বিষয়। এ জন্য অনেক শিক্ষার্থী, অনেক নাগরিক হতাশ। তবে তিনি আশাবাদী। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা বুঝতে পারছেন, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। কারণ, মানুষ আর সেটা মেনে নেবে না। যদিও পুরোনো শাসনকাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়নি, তবে পুরোনো শাসন কাঠামোর পুনর্গঠন করে তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ, সেই কাঠামো কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—এসব নিশ্চিত করতে পারবে না। মানুষ এখন যা চায়, তার সঙ্গে তারা আপস করবে না। রাজনীতিকে আরও উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের উৎস নিয়ে ভাবতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতেই হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন করে সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণেরা ২০২৪ সালের আগের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশকে ফিরে যেতে দেবে না। আগামীর বাংলাদেশে তরুণেরাই রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও গুণগত পরিবর্তন আনবে।
বাংলাদেশে শিক্ষাগত বৈষম্য সবচেয়ে গুরুতর বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এখানে অল্প একটা গোষ্ঠী উন্নত শিক্ষা পেয়ে থাকে। এর থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো শুরু করা না গেলে এই সংকট আগামী দশকেও এই অঞ্চলের মানুষকে ভোগাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তৌহিদ হোসেন। তাই তিনি রোহিঙ্গাদের নিয়ে আগামী সাত-আট বছর সামনে রেখে একটি পরিকল্পনার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য আশার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেন মালয়েশিয়ার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইসলামিক স্টাডিজের (আইএআইএস) চেয়ারম্যান মাজলি বিন মালিক। বাংলাদেশের শ্রমিকনির্ভর অর্থনীতির ওপর নির্ভর না করে জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উল্লেখ করেন। সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকির প্রশ্নে বাংলাদেশের নেতৃত্বদানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ইতিবাচক সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরেন মাজলি বিন মালিক। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ আসিয়ানকে পাশে পাবে।
নেপালের সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী দীপক গিওয়ালি বলেন, ‘ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে এসে আমরা দাঁড়িয়েছি। যেটা শুধু বেঙ্গল ডেল্টাই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই বাঁক বদলের মোড়।’
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন দীপক গিওয়ালি। তিনি বলেন, কারণ, যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা ওয়েস্ট মিনিস্টার ধাঁচের গণতন্ত্র এখানে ব্যর্থ হয়েছে। নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কায় তা ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশে তা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর জীবদ্দশায় নেপালে তিনবার গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে।
দীপক গিওয়ালি বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা গণতন্ত্রের কথা বলছি? নাকি সুশাসনের? আমাদের দল, নির্বাচনসহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল নির্যাস জনগণের ক্ষমতায়ন, তা নিশ্চিত করতে এই অঞ্চলের দেশগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশেই কোনো সুশাসন নেই, জবাবদিহি নেই। কাজেই আমরা কী ধরনের গণতন্ত্র চাই, তা নিয়ে আমাদের আবার ভাবতে হবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রশ্নটি নিয়ে ভাবা উচিত।’
এ অঞ্চলের দেশগুলোর অভিন্ন যাত্রাপথের স্বার্থে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার ওপর জোর দেন নেপালের সাবেক এই পানিসম্পদমন্ত্রী।
দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করেন সংসদে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।
ভারতের দ্য ওয়্যার-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভরদ্বারাজন বলেন, বাংলাদেশ এখন যে অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তার প্রভাব বৈশ্বিক। তবে এখানকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অর্থনৈতিক বৈষম্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৫-এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, বঙ্গোপসাগরই বাংলাদেশের বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্তির প্রধান দ্বার।
দায়রা একটি ঢাকাভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। তারা বঙ্গীয় বদ্বীপে জ্ঞানের উৎপাদন ও অগ্রগতি নিয়ে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গতিশীলতা বোঝাপড়ার চর্চায় নিবেদিত।