ছাত্রলীগ: সময়ের প্রয়োজনে যে সংগঠনের জন্ম

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জানুয়ারি ৪, ২০২২, ১২:২৪ এএম

ছাত্রলীগ: সময়ের প্রয়োজনে যে সংগঠনের জন্ম

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সময়ের প্রয়োজনে জন্ম নেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নামের সংগঠনটি। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসের উত্তাল সেই দিনগুলোতেই লেখা হয় বাংলাদেশ নামের এক স্বপ্নরাষ্ট্রের ভাগ্য।

দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের স্বাধীন দু'টি রাষ্ট্র। বৃটিশ শাসনের অবসান হলেও স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে সেদিন মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারেনি বাংলার মানুষ। কথা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রে  বৈষম্যের শিকার হবে না কোন মানুষ। কিন্তু বৈষম্য পিছু ছাড়েনি। বিশেষ করে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালির উপর চলতে থাকে আধিপত্যকামী পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন ও নানাবিধ বঞ্চনা। বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারটুকুও কেড়ে নিতে চায় পাকিস্তানীরা। এমন  ক্রান্তিকালে মানুষকে রাজনীতি সচেতন করে নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের।

জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই ভাষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ছয় দশকের সবচেয়ে সফল আর সাহস প্রদর্শণ করে সংগঠনটি।

শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতি- এই তিনটি সংগঠনের মূল মন্ত্র। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সংগঠনটি অতিক্রম করেছে পথচলার ৭৪ বছর।

ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাজপথে ছিলেন সোচ্চার। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মঘটের প্রথম সারির নেতা তিনি। এ নিয়ে বারংবার সহযোদ্ধাদের নিয়ে কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল প্রণিধানযোগ্য।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ছাত্রলীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিব আর তাতে ছাত্রলীগ ছিল তার ভ্যানগার্ড।

১৯৬২ সালে তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার কর্তৃক গঠিত শরিফ কমিশন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্য ও স্বার্থের অনুকূলে একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল। সেই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধেও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণআন্দোলন ও গণজাগরণ তৈরি হয়। সেই বাষট্টির উত্তাল দিনগুলোতে রক্ত ঝরেছে অসংখ্য ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর। সে হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে অগ্রসরের ইতিহাস, ছাত্রলীগের রক্তঝরা ইতিহাসেরই ইতিবৃত্ত।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্রলীগ ছিল রাজপথে সক্রিয়। ছয় দফা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে নানা সময়ে বিভেদ ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের ছয় দফার পক্ষে ছাত্রলীগের ছিল শক্ত অবস্থান। এ কারণে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেদিন আওয়ামী লীগের বৈঠকের বাইরে কঠোর পাহারা বসাতে হয়েছিল ছাত্রলীগের কর্মীদেরকেই। আর এই ছয়দফাই শেষতক বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। যে সনদ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন তথা স্বাধীনতা লাভের পথে নিয়ে যায়।

১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় অংশগ্রহন করেন এবং দলের জন্য বিজয় ছিনিয়ে নেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও জোরালো ভূমিকা রাখে ছাত্রলীগ।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের তিন দিনব্যাপী সম্মেলন শুরুর দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন:
ছাত্রলীগের সঙ্গে বাংলার সংগ্রামের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ছাত্রলীগের মধ্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা হয়েছিল। জনতার সঙ্গে একাত্মতা ও সংগ্রামী ঐতিহ্যের জন্য ছাত্রলীগের মৃত্যু ঘটেনি। অনুরূপভাবে আওয়ামী লীগ থেকে বহুবার বহু নেতা দলত্যাগ করলেও এ সংগঠনের অপমৃত্যু হয়নি। ... নেতারা চলে গিয়েছিল, কিন্তু নীতি যায়নি। নেতার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু আদর্শ বজায় রাখলে সংগঠনের মৃত্যু হয় না।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নানা সংকটকালে ছাত্রলীগ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তবে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে বারবার আলোচনাতেও এসেছে সংগঠনটি।

Link copied!