তিন বছর পর আজ শুক্রবার (২৪ জুন) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ৩৯ তম সিনেট অধিবেশন। দীর্ঘ সময় পর সিনেট অধিবেশনের ঘোষণা আসলেও মেয়াদোত্তীর্ণ প্রতিনিধিদের নিয়েই অনুষ্ঠিত হবে জাবির এই সিনেট অধিবেশন। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন সিনেটে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন না করতে পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অংশীজনরা।
বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট ১৯৭৩ এর ১৯(১) ধারা অনুযায়ী সিনেট সদস্যরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (এক বা একাধিক), কোষাধ্যক্ষ, সরকার মনোনীত পাঁচ জন সরকারি কর্মকর্তা, স্পিকার মনোনীত পাঁচ জন সংসদ সদস্য, আচার্য্য মনোনীত পাঁচ জন শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত পাঁচ জন রিসার্চ বডির প্রতিনিধি, একাডেমিক কাউন্সিল মনোনীত পাঁচজন কলেজ অধ্যক্ষ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ঢাকার চেয়ারম্যান, রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটসদের মধ্য থেকে পঁচিশ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত তেত্রিশ জন শিক্ষক প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচিত পাঁচ জন ছাত্র প্রতিনিধি।
এ্যাক্ট অনুসারে সিনেট অধিবেশনের মোট সদস্য ৯২ জন (উপ-উপাচার্য একজন হলে)। তবে এবারের সিনেটে রয়েছেন ৮২ জন সদস্য। বাকি আসনগুলো শূণ্য রয়েছে।
এ্যাক্টের ১৯(২) ধারায় বলা হয়েছে ছাত্র প্রতিনিধি ব্যতীত অন্যান্য সিনেট সদস্যরা তিন বছরের জন্য দায়িত্বে থাকবেন। ছাত্র প্রতিনিধিরা থাকবেন এক বছরের জন্য। তবে তারা পরবর্তী প্রতিনিধি নির্বাচিত, মনোনীত অথবা নিযুক্ত হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
এদিকে জাবির সিনেটে ১৯(১-আই) ধারার রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটসদের মেয়াদ ২০২১ সালের জানুয়ারি ও ১৯(১-জে) ধারার শিক্ষক প্রতিনিধিদের মেয়াদ ২০১৮ সালের অক্টোবরে শেষ হলেও পরবর্তীতে সুযোগ থাকলেও নতুন প্রতিনিধি নির্বাচনে নেয়া হয়নি কোনও উদ্যোগ। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন ও ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া বিগত তিন দশক ধরে নেই ছাত্র প্রতিনিধি। এতে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের নায্য অধিকার আদায়ে।
করোনা মহামারির পর গত বছরের নভেম্বরে সশরীরের ক্লাস-পরীক্ষা শুরু করে জাবি প্রশাসন। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন, কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও হয়নি সিনেটে মেয়াদ উত্তীর্ণ পর্ষদগুলোর প্রতিনিধি নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনগুলো মেয়াদ উত্তীর্ণ পর্ষদগুলোর নির্বাচনের দাবি জানালেও প্রথমে করোনার অজুহাত ও পরে উপাচার্য পরিবর্তনের কারণ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা এড়িয়ে যায়। এছাড়া সঠিক সময়ে নির্বাচন করতে না পারার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই দায় চাপিয়েছেন সাবেক ও বর্তমান উপাচার্যের উপর।
সিনেটের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটস প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমগীর কবীর বলেন, ‘নির্বাচনগুলো নির্দিষ্ট সময় ও নিয়মের মধ্যেই হওয়া উচিত। রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটস নির্বাচন প্রসেসটা কিছুটা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হলেও প্রশাসন চাইলে তা পারে। সকলের আন্তরিকতা থাকলে নির্দিষ্ট সময়ে তা করা সম্ভব।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট জাবি শাখার সভাপতি আবু সাঈদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোন ছাত্র প্রতিনিধি নেই। পাশাপাশি রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়া সদস্যদের নিয়ে সিনেট অধিবেশন অনেকটা জোর করে কার্যক্রম চালানোর মতো। অধিবেশনে যারা উপস্থিত হবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা কতটুকু তা স্পষ্ট নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় না থাকলে প্রশাসনের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোও অযোক্তিক ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যার প্রমাণ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে মাস্টার প্লান না থাকা। বিশবিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে না পারার জন্য প্রশাসনই দায়ী। তাই প্রশাসনের উচিত অতিদ্রুত মেয়াদোত্তীর্ণ পর্ষদগুলোতে নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা।’
সিনেটের শিক্ষক প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রানা বলেন, ‘উপাচার্যকে বলা হয়েছিল সিনেট সহ সকল পর্ষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর পরই এই কার্যক্রম সম্পন্ন করা যেতো। মাঝখানে সমস্যা ছিল শুধু নতুন ভিসি কে হবেন তা নিয়ে। এরপর নতুন ভিসি প্রথম একমাস প্রজ্ঞাপনে দায়িত্ব সম্পর্কে কিছু উল্লেখ না থাকায় কাজ করতে পারেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে মেয়াদোত্তীর্ণ পর্ষদগুলোতে নিয়মিত নির্বাচন হওয়া দরকার।’
সময় পাওয়ার পরেও সিনেটে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচনে কেন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি এই বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায় নি।
উল্লেখ্য, গত ১৭ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক প্রজ্ঞাপনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক নূরুল আলমকে সাময়িকভাবে নিয়োগ দেয়া হয়। উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য মেয়াদোত্তীর্ণ সকল পর্ষদে দ্রুত নির্বাচনের আশ্বাস দেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই মাসের বেশী সময় অতিবাহিত হলেও তিনি তার একটিও বাস্তবায়ন করতে পারেননি।