ইউরোপ- আমেরিকায় ভুয়া ভ্যাকসিন কার্ডের রমরমা ব্যবসা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

আগস্ট ৯, ২০২১, ০৪:৪১ পিএম

ইউরোপ- আমেরিকায় ভুয়া ভ্যাকসিন কার্ডের রমরমা ব্যবসা

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন কার্ডের চাহিদা বাড়তেই,ইউরোপ-আমেরিকায় ভুয়া কার্ডের ব্যবসা নিয়ে জাকিয়ে বসেছে একদল অসৎ ব্যবসায়ী। এবিষয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বলেছে, ফেডারেল কর্মীদের অবশ্যই টিকা দিতে হবে এবং নিয়মিত পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দিতে হবে। মাস্কের প্রয়োজনীয়তা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। ক্যালিফোর্নিয়াও সরকারি কর্মীদের ভ্যাকসিন নেয়া  অথবা সপ্তাহে একদিন করে কোভিড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। নিউইয়র্ক খুব শিগগিরই রেস্টুরেন্ট এবং জিমে প্রবেশের আগে গ্রাহকদের  টিকা দেয়ার প্রমাণের পরিকল্পনা করছে। ওয়াল্ট ডিজনি , ওয়ালমার্ট ,মাইক্রোসফট , টাইসন - এর মতো বড় বড় কোম্পানি তাদের কর্মীদের ভ্যাকসিনেশনের ওপর জোর দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু অংশে হোটেলে খাওয়া, যাদুঘরে যাওয়া এবং বড় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোতে অংশ নিতে টিকা দেয়ার প্রমাণ চাওয়া হয়েছে ।

এই ধরণের কড়া কোভিড বিধির জেরে মাথাচাড়া দিয়েছে ভ্যাকসিনেশন সার্টিফিকেটের একটি জাল চক্র। সরকারি তদন্তকারী এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে, টিকা দেওয়ার অবৈধ প্রমাণ বিক্রি করার স্কিমগুলো সামাজিক মিডিয়া সাইট, মেসেজিং অ্যাপস যেমন টেলিগ্রাম এবং ডার্ক ওয়েবে মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েছে।সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম ক্যাসপারস্কির গবেষক দিমিত্রি গালভ জানাচ্ছেন , যেহেতু দেশের জনসংখ্যার একটি অংশ এই নতুন কোভিড বিধি এড়িয়ে চলতে চাইছে সেই সুযোগে এই অসাধু চক্র তাদের একাধিক অফার নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে।

গালভ মার্চ মাস থেকে ভুয়া ভ্যাকসিন কার্ড বিক্রির উপর নজর রেখে চলেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রগুলির দ্বারা অনুমোদিত জাল ভ্যাকসিনেশন কার্ডগুলি অ্যামাজন, ইবে এবং ইটিসির মতো সাইটে বিক্রির জন্য তুলে ধরা হয়েছে। মে মাসে, কর্মকর্তারা ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি বারের মালিককে গ্রেপ্তার করেছিলেন যার বিরুদ্ধে এক একটি নকল ভ্যাকসিন কার্ড প্রায় ২০ ডলার দিয়ে বিক্রির অভিযোগ ছিল। অপরাধীর বিরুদ্ধে নকল পরিচয় বানানো , সরকারি নথি জাল করা এবং ভুয়া মেডিকেল রেকর্ড তৈরী করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

বিচার বিভাগের একজন মুখপাত্র বলছেন , 'আমাদের কাছে সঠিক সংখ্যা না থাকলেও এইধরণের ভুয়ো ভ্যাকসিন কার্ড দেয়ার নানা স্কিম সামনে আসছে।'

ভুয়া কার্ডের ব্যবসা শুধু অনলাইনেই চলছে তা  নয়, গত মাসে, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যিনি রোগীদের সিডিসি-র অনুমোদিত ভ্যাকসিনেশন কার্ড প্রদান করছিলেন  যাতে লেখা ছিল রোগীরা মডার্না ভ্যাকসিন পেয়েছেন । কিছু রোগীকে আবার ফাঁকা কার্ড দিয়ে মডার্না ভ্যাকসিনের লট নম্বর বসিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন কীভাবে ভুয়া ভ্যাকসিন কার্ড তৈরি করতে হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি একক ফেডারেল ডিজিটাল কার্ডের অভাব প্রতারকদের কাজকে সহজ করে দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সিডিসি কর্তৃক জারি করা ছোট সাদা কার্ডগুলি সহজেই জাল করা যায় এবং টিকা দেয়ার প্রমাণের প্রধান উৎস হতে পারে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিটি ব্যক্তির জন্য একটি ডেডিকেটেড কিউআর কোড সহ একটি ডিজিটাল সার্টিফিকেট রয়েছে।২৭ টি দেশ তাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন কার্ড বিতরণ করছে।

ভ্যাকসিন কার্ড মূলত শুরু হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির মধ্যে ভ্রমণের সুবিধার্থে । এখন সেগুলি হোটেল-রেস্তোরাঁতেও ব্যবহার করা হচ্ছে।  সার্টিফিকেটগুলি প্রমাণ করে  কে টিকা পেয়েছেন , কে কোভিড নেগেটিভ এবং করা সম্প্রতি রোগ থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ।ইতালিতে, প্রায় ৩০ টি সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল রয়েছে যা থেকে  জাল সার্টিফিকেট বিক্রি হয়েছে ৫০০ টি-র  মতো। ইতালিয়ান পুলিশ কমান্ডার ইভানো গ্যাব্রিয়েলির মতে, টেলিগ্রাম হচ্ছে ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রির জন্য ব্যবহৃত প্রধান প্লাটফর্ম।যদিও টেলিগ্রামের একজন মুখপাত্র বলছেন , ইতালীয় সরকার অনুরোধ করার পর তারা সার্টিফিকেট বিক্রির শাখাটি বন্ধ করে দিয়েছেন ।এদিকে  যখন ভুয়া  সার্টিফিকেট দেয়ার একটি  চ্যানেল বন্ধ করা হচ্ছে , তখন একই অফার নিয়ে  হাজির হচ্ছে বেশ কিছু নতুন চ্যানেল ।কিছু চ্যানেল বন্ধ করে হয়তো সাময়িক সমাধান হবে, তবে এর দীর্ঘস্থায়ী সমাধান প্রয়োজন  বলে জানাচ্ছেন , মিলানের তদন্তকারী আধিকারিক ইউজেনিও ফুসকো।  জুলাইয়ের মাঝামাঝি ফরাসি পুলিশ ভুয়া ভ্যাকসিন কার্ডের ক্রেতাদের মধ্যে ৪০০ জনকে খুঁজে বের করেছিল । যদিও আসল সংখ্যাটা এর থেকে তিনগুণ বেশি।  ভ্যাকসিনেশন সার্টিফিকেটের মতো যেকোনো ধরনের প্রতারণামূলক দলিল তৈরি করা ফ্রান্সের মতো দেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ । এর জন্য ৪৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।  সেই সঙ্গে তিন বছরের কারাবাস। এই প্রতারণাচক্র রুখতে আগামী দিনে কঠিন আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন । সেই সঙ্গে মোটা টাকা জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। জার্মানির সেন্টার ফর মনিটরিং, অ্যানালাইসিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির গবেষক মিরো ডিট্রিচ বলছেন, জার্মানিতে ডার্ক ওয়েবে প্রথমে নকল সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেখানে কোনো ক্রেতা ছিল না।একবার যখন ভ্যাকসিন না নেয়া মানুষদের জন্য  একাধিক বিধি নিষেধ আরোপ করা হলো, তখন সবাই ভুয়া কার্ড নিতে ভিড় জমাতে শুরু করলো টেলিগ্রামে। 

তবে ক্যাসপারস্কির কর্মকর্তা গালভ বার বার সতর্ক করে বলছেন  যে, জাল সার্টিফিকেটের ক্রেতারা কোনো উপকার পাবেন না। উল্টো তাদের অর্থ অপচয় হবে।  সেই জায়গায় সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন নিলে দেশকে মহামারী মুক্ত করা সম্ভব বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তাই পুলিশ প্রশাসনের পরামর্শ , ভুয়া ভ্যাকসিন কার্ডের চক্রে পা দেবেন না।  এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

 

Link copied!