করোনা পরিস্থিতির ফলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ কমেছে। এ অবস্থায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে নতুন করে কর আরোপ না করে এর আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার।ঈদের আগে এ সংক্রান্ত একাধিক বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী সায় দেন।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে না
বাজেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা নতুন বাজেটে বাড়ছে না। বরং চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় জিডিপির বিপরীতে ২০২১-২২ অর্থবছরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কম। এ জন্য অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব বোর্ডের নতুন কর আরোপের দরকার পড়বে না। এ ছাড়া অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে সাধারণ নাগরিকদের মনোবল বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। অর্থবছরের পুরোটা সময় কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে কাটলেও জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের এই আদায় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ছে
সূত্র জানায়, জীবন ও জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়ে সামনে বছরের বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ জন্য স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় করোনার ভ্যাকসিন কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে। ভ্যাকসিন কিনতে যেন অর্থের কোনো সংকট না হয় সে জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হবে। একই সঙ্গে শিল্প খাতকে চাঙ্গা রাখতে চালু থাকা প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো চালু রাখা হবে। এদিকে মহামারী করোনার আঘাতে ধসে পড়েছে।
প্রণোদনা চলমান থাকবে
২০২০ সালের শুরুতে প্রথম ধাক্কায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যা এখনো চলমান। এসব কর্মসূচি আগামী বছরের বাজেটেও চলমান থাকবে। এদিকে করোনার ধাক্কায় দেশের সব ধরনের উৎপাদন কমেছে। আয় কমেছে সরকারের ও বেশিরভাগ মানুষেরও। অথচ বেড়েছে ব্যয়। ফলে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) টার্গেট কমিয়ে আনছে সরকার। চলতি বছরের বাজেটে জিডিপির টার্গেট ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। বাজেটে সেটাকে কমিয়ে ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
কর বৃদ্ধি না করে ফাঁকির সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগ
আগামী বাজেটে নতুন কর আরোপ না করে কর ফাঁকি বন্ধে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী বাজেটে নতুন কোনো কর কিংবা কর হার বৃদ্ধি করা উচিত হবে না। প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে করের আওতা বাড়ানো ও কর ফাঁকি কমিয়ে আনতে হবে। যারা কর দেয় না, তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবসায়ীক গোষ্ঠীর সুবিধায় বিভিন্ন রেয়াতি সুবিধা রয়েছে; যা এখন বাদ দিতে হবে। আবার অভ্যন্তরীণ বাজারে শ্রমঘন শিল্পের ক্ষেত্রে কর হার নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখা জরুরি।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে যুক্তিহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিকবাবে যুক্তিহীন, নৈতিকভাবে গর্হিত এবং রাজনৈতিকভাবেও অপকারী হচ্ছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত না আনা কিংবা তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে না আনা। এসব সুযোগ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। একদিকে দরিদ্রের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারব না, অন্যদিকে অবৈধ অর্থকে বৈধ করার সুবিধা স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করি। আর যারা নিয়মিত কর দেয় তাদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে হয়রানিসহ ইত্যাদি কাজ যেন বন্ধ করা হয়।
দেশে রাজস্ব আহরনের চিত্র
এনবিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের প্রধান তিন খাত আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর-মূসক বা ভ্যাট ও আয়কর থেকে গত অর্থবছরের আগের সময়ের চেয়ে আদায় বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে আবগারি শুল্ক, স্থানীয় পর্যায় থেকে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক থেকে। মোট আদায় হয়েছে ৬৮ হাজার ৪৭০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৬৫ হাজার ১২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আমদানি ও রপ্তানি খাত থেকে শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক হিসেবে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত থেকে আদায় হয়েছিল ৪৮ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। এবার আয়কর খাত থেকে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত থেকে আদায় হয় প্রায় ৫২ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।