অপরাধের সব সূচক ছাড়িয়ে গেছে এ বছরের জানুয়ারি

সোহেল তারেক

ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৫, ০১:০৪ পিএম

অপরাধের সব সূচক ছাড়িয়ে গেছে এ বছরের জানুয়ারি

ছবি: এআই

অপরাধের সব সূচক ছাড়িয়ে গেছে এ বছরের জানুয়ারি মাস। এর ধারাবাহিকতা দেখা গেছে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েও। দেখা গেছে মহাসড়কে বাসের ভেতরে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ। মধ্যরাতে ব্যবসায়ীকে গুলি করে সোনাদানা ছিনতাই। দিনদুপুরে খোদ রাজধানীতে চলন্ত বাসে অস্ত্র ঠেকিয়ে লুটতরাজ। প্রান্তিক জনপদে ট্রিপল মার্ডার। বীরদর্পে দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর গ্যাং। এসব একের পর অপরাধের ঘটনায় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতাবোধ ও আতঙ্ক। অপরাধের নানা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে ভীতি।

যৌথ বাহিনীর ‘ডেভিল হান্ট’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু হলেও খুনোখুনি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, মব ভায়োলেন্স এমন কোনো অপরাধ নেই, যা ঘটছে না। অভিযানের মধ্যেও অপরাধীরা যখন এমন বেপরোয়া, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানামুখী প্রশ্ন।   

সর্বশেষ গত রোববার রাতে রাজধানীর বনশ্রীতে বাসায় ফেরার সময় এক সোনা ব্যবসায়ীকে গুলি ও কুপিয়ে জখম করে স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার ভিডিও চিত্র ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে আতঙ্ক তৈরি হয়।

পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জানুয়ারিতে সারাদেশে ২৯৪ জন খুন হন। একই মাসে ১৭১টি চুরি, ৭১ ডাকাতি, ১০৫টি অপহরণ এবং ১ হাজার ৪৪০ নারী ও শিশু নিপীড়নের ঘটনা ঘটে।

সব মিলিয়ে গত জানুয়ারিতে দেশে ডাকাতি ও চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি। অর্থাৎ জানুয়ারিতে চুরি ও ডাকাতি বেড়েছে ৬৯ শতাংশ। ডাকাতি ও চুরির ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি, অর্থাৎ ৭০ শতাংশ বেশি।

আর গত আগস্ট থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছয় মাসে ডাকাতি ও চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪৫টি, যা ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের তুলনায় ৩৮২টি অর্থাৎ ৫০ শতাংশ বেশি।

রাজধানীসহ সারাদেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে বিশেষ অভিযানের মধ্যেও বেপরোয়া অপরাধীরা। ডেভিল হান্টে গত ১৬ দিনে ৯ হাজার ২৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে ২৮৯টি মামলায় ৭৫৮ ‘ছিনতাইকারীকে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১১৫ জনই জামিনে বেরিয়ে গেছেন। অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়েছে যাচ্ছেন অল্প দিনের মধ্যে। যেমন গত ১৬ জানুয়ারি সূত্রাপুর থানার দস্যুতার এক মামলায় ফাইম খান নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পরদিনই জামিন পেয়ে যান। পুলিশ বলছে, জামিন পেয়ে অপরাধীরা আবার অপরাধে জড়াচ্ছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর্মসংস্থানের অভাবও এখন অপরাধ বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ।

পরিস্থিতি এমন পর্যায় পৌঁছায় যে রাত তিনটায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভা। সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষকে আশ্বস্ত করতেই আজকে (গতকাল) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সভা করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে আপনারা পরিস্থিতি টের পাবেন।’  

এদিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল রাজশাহীতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে, বিশেষ করে রাতে ছিনতাই। এ নিয়ে বিশেষ একটি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি বলেন, র‍্যাব, পুলিশের অ্যান্টিটেররিজম ইউনিট (এটিইউ) ও ডিএমপি ঢাকায় একসঙ্গে বিস্তৃত টহল কার্যক্রম চালাবে। সেটা গতকাল রাত থেকেই শুরু হওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘দেখি, এভাবে পরিস্থিতি উন্নতি হয় কি না। এরপরও যদি না হয়, তাহলে বিকল্প চিন্তা করব।’

Link copied!