প্রতীকী ছবি
বিশ্ব জুড়ে বাড়ছে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্তের সংখ্যা। এর প্রভাবে লিভার সিরোসিস বা ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই সংখ্যা বাড়তে থাকলে প্রকট আকার ধারণ করবে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজই বেশি হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এর প্রধান কারণ স্থূলতা ও কায়িক শ্রমের অভাব এবং ব্যায়াম না করা। যুক্তরাষ্ট্রে লিভার রোগের সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি)। এই অবস্থায় অতিরিক্ত চর্বি লিভারে জমা হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, যারা স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়েবেটিসে (বহুমূত্র বা মধুমেয়) ভুগছে তাদের জন্য এটি বিপদ সংকেত।
নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ দুই ধরনের হয়: ১. নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (এনএএফএল)- এতে প্রদাহ ছাড়াই লিভারে চর্বি জমা হয়, যদিও লিভারের বৃদ্ধি ব্যথার কারণ হতে পারে; ২. নন-অ্যালকোহলিক স্টিটোহেপাটাইটিস (এনএএসএইচ) প্রদাহের সঙ্গে থাকে ও চিকিৎসা না করা হলে সিরোসিস হতে পারে।
কোনো একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির সুস্থ শরীরে, লিভার টক্সিন অপসারণ করে ও পিত্ত তৈরি করে একটি সবুজ-হলুদ তরল সৃষ্টি করে। যা চর্বিকে ফ্যাটি অ্যাসিডে ভেঙে দেয় যাতে তারা হজম হতে পারে। ফ্যাটি লিভার ডিজিজ লিভারের ক্ষতি করে ও একে যেমন কাজ করা উচিত তেমন কাজ করতে বাধা দেয়, তবে জীবনযাত্রার পরিবর্তনগুলো একে খারাপ হওয়া থেকে আটকাতে পারে।
চিকিৎসকরা বলছেন, প্রকৃত অর্থে ফ্যাটি লিভারের কোনো চিকিৎসা নেই। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম ডায়েট, এক কথায় নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করলে এর থেকে সুরক্ষিত থাকা যায়।
প্রতিদিন খান ১ কাপ কফি
কফি অস্বাভাবিক লিভারের এনজাইম কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ১ কাপ কফি আপনার লিভারকে নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন থেকে জানা গেছে, যারা নিয়মিত কফি খান তাদের এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কম।
বেশি বেশি সবুজ শাকসবজি খান
পালং শাক ও অন্যান্য শাকসবজিতে পাওয়া যৌগগুলি ফ্যাটি লিভার রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন থেকে জানা গেছে, ২০২১ সালের একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা অনুযায়ী পালং শাক খাওয়া বিশেষভাবে এনএএফএলডির ঝুঁকি কমায়। এর সবুজ পাতায় নাইট্রেট ও স্বতন্ত্র পলিফেনলের কারণে ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসে।
তালিকায় রাখুন মটর শুঁটি ও সয়া
চিকিৎসকরা জানান, মটর শুঁটি ও সয়া উভয়ই এনএএফএলডির ঝুঁকি কমায়। ডায়েট ও লিভারের রোগের স্বাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে মসুর ডাল, ছোলা, সয়াবিন ও মটর শুঁটি শুধু পুষ্টির দিক থেকে শুধু ভালো উৎস তা নয়, এসবে প্রতিরোধী স্টার্চও আছে। যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে। এমনকি স্থূলতায় আক্রান্তদের রক্তের গ্লুকোজ ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করতে পারে।
খাবার তালিকায় টোফু রাখতে ভুলবেন না
ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এড়াতে বা এর থেকে সুরক্ষিত থাকতে খাবার তালিকায় টোফু রাখতে কোনোভাবেই ভুলবেন না। এটা একটা কম চর্বিযুক্ত খাবার যা প্রোটিনের ভালো উৎস। আপনি যদি আপনার চর্বি ব্যবহার সীমিতের চেষ্টা করেন, তবে এটা হতে পারে আদর্শ খাবার।
বেশি বেশি মাছ খান
বেশি বেশি শাকসবজির পাশাপাশি আপনাকে মাছ খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। বিশেষ করে ফ্যাটি মাছ যেমন স্যামন, সার্ডিন, টুনা ও ট্রাউটে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে এসব মাছে। তাই প্রতিদিন এসব মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন।
রোগের ঝুঁকি কমায় ওটমিল
ফ্যাটি লিভার থেকে সুরক্ষিত থাকতে ওটমিলের মতো ফাইবার-সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন। এটা এনএএফএলডি-সম্পর্কিত রোগের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম। পাশাপাশি ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আরও পড়ুন: চিনি খাওয়া ছেড়ে দেওয়া শরীরের জন্য কতটুকু স্বাস্থ্যকর
লিভারের শত্রু চিনি
আমাদের অনেকেরই চা-কফির মধ্যে অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অভ্যাস আছে। শুরুতেই ফ্যাটি লিভার থেকে সুস্থ থাকতে প্রতিদিন অন্তত ১ কাপ কফি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু অবশ্যই এবং অতি-অবশ্যই চিনি ছাড়া। কেননা চিনি হলো শর্করা।
চিকিৎসকরা চিনিকে ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে উল্লেখ করে থাকেন। সাদা চিনি ও চিনিযুক্ত যেকোনো খাবার বা পানীয় এবং ডেজার্ট এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন
আমরা অনেকে মদ্যপান করে থাকি। কিন্তু আপনি জানেন কি, অ্যালকোহল সেবনের ফলে ফ্যাটি লিভার হওয়ার আশঙ্কা আছে? চিকিৎসকরা বলে থাকেন, অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আর আপনি যদি মদ্যপান করে থাকেন, তবে এখনই সাবধান হোন।
ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস দূর করুন
আপনার যদি গরম গরম ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে দ্রুত এই অভ্যাস ছাড়ুন। মার্কেটে বা বিভিন্ন ফুডশপে হরহামেশা আমরা চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই অথবা যেকোনো ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। এগুলো কোনোভাবে ছোঁবেনই না। আপনি যদি ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে আজই এসব মুখরোচক খাবার ছাড়ার সংকল্প করুন।
লবণ খাওয়ার অভ্যাস ছাড়ুন
উপ-শিরোনাম দেখে ভড়কে যাবেন না। দৈনিক ২ হাজার ৩০০ মিলিগ্রামের বেশি লবণ স্বাস্থ্যের জন্য অনিষ্টকর। অর্থাৎ রান্নায় যে লবণ ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তার বাইরে যেকোনো লবণ, লবণযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা চিরতরে ছেড়ে দিন। অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস আপনাকে মৃত্যুর মুখোমুখি পর্যন্ত করতে পারে।
সূত্র: হেলথ লাইন ও মেডিকেল নিউজ টুডে