তারামন বিবি: নিভৃতে থাকা এক সাহসী যোদ্ধা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

ডিসেম্বর ১, ২০২১, ০৪:৩৬ পিএম

তারামন বিবি: নিভৃতে থাকা এক সাহসী যোদ্ধা

বিশ্ব ইতিহাস কিংবা বাঙালির মুক্তি আন্দোলন- নারীর ভূমিকা অদম্য। যেকোনো অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ বা স্বাধীনতাযুদ্ধে নারীর অবদান কোনো অংশেই কম নয়। রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে বিপুল বিক্রমে নারীরা লড়াই করেছে যুগে যুগে। 

অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে দেশের নারীরা লড়ে গেছেন। ধর্ষণের শিকার বা অত্যাচারিত হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটা যেমন বড় হয়ে উঠেছে, তার চেয়েও বড় সত্য এই যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নারীসমাজ লড়াই করেছে, দেশের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, রক্ষা করেছে।

এমনই একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক তারামন বিবি। তারামন বিবি মুক্তিবাহিনীর ১১ নম্বর সেক্টরের একটি দলের সঙ্গে ছিলেন। 

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা, তাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, পাকিস্তানি বাহিনীর খবর সংগ্রহ করা এবং সম্মুখযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন তিনি। দুর্ধর্ষ সেই কিশোরীর অসীম সাহসিকতার জন্য পেয়েছেন ‘বীর প্রতীক’ খেতাব। 

অদম্য মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি

মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে তারামন বিবি বলেছিলেন, “আমাদের বাড়ি ছিল রাজীবপুরের আলেকচর শংকর-মাধবপুর ইউনিয়নে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ১৪। সে সময় দেশে শুরু হলো তোলপাড়। শয়ে শয়ে মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে। কে কোথায় যাচ্ছে জানি না। আমরাও পালিয়ে যাই কোদালকাঠিতে।

‘একদিন, দিন-তারিখ মনে নাই, জঙ্গলে কচুর মুখি তুলছিলাম। একজন বয়স্ক মানুষ (মুহিফ হালদার), আমাকে বললেন, “তুমি আমাদের ক্যাম্পে কাজ করবা। ভাত রাইন্ধা দিবা। কী, পারবা না মা?” সেদিন কোথা থেকে যেন একটা শক্তি পেলাম। মনে হলো, এই তো সুযোগ। মাথার ওপর রক্ষা করার মতো কেউ নাই, যার ভরসায় বেঁচে থাকব। মরতে তো হবেই। যুদ্ধ করে বাঁচার চেষ্টা করলে দোষের কী।”

মুক্তিযুদ্ধের সময় তারামন বিবি কুড়িগ্রাম জেলার শংকর মাধবপুরে ছিলেন। তখন ১১ নং সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের। মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। যিনি তারামনের গ্রামের পাশের একটি ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তারামনকে ক্যাম্পে রান্নাবান্নার জন্য নিয়ে আসেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারামনের সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার তাকে অস্ত্র চালনা শেখান।

পরবর্তীতে সহকর্মীদের কাছ থেকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

খেতাব দেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে তা তুলে দিতে ২২ বছর লেগে যায়। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন তারামন বিবি। তাঁর নাম ছিল শুধু গেজেটের পাতায়। ১৯৯৫ সালে প্রচারের আলোয় আসেন। 

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তার সাহসীকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর প্রতীক’উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি দে প্রথম তার সন্ধান পান। এ কাজে বিমল কান্তিকে সহায়তা করেন কুড়িগ্রামের রাজীবপুর কলেজের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকী।

এরপর নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। সেই সময় তাকে নিয়ে পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। অবশেষে ১৯৯৫ সালের ১৯শে ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার এক অনাড়ম্বর পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে তারামন বিবিকে বীরত্বের পুরস্কার তার হাতে তুলে দেন। তারামন বিবি অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তাঁর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা সাহসী বীর

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে যেদিন তিনি পদক গ্রহণ করেন, সেদিন সাংবাদিকদের সামনে তারামন বিবি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বলেছিলেন, সব মুক্তিযোদ্ধাই যাতে সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারেন, সরকার যেন তার ব্যবস্থা করেন। তিনি তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আরও বলেছিলেন, পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে যারা দেশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁরা কেউ যেন তার মতো অনাহারে না থাকেন। তার সেই কথা শাসকশ্রেণী এবং সমাজের অধিপতিশ্রেণীর কানে প্রবেশ করেছিল, তা জোর দিয়ে বলা যায় না।

আফসোসের ব্যাপার হলো, প্রথম থেকেই আমরা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলা করেছি। পিয়ার চাঁন, কাঁকন বিবি, তারামন বিবিদের অনেক দিন পরে আমরা খুঁজে পেয়েছি। ক্যাপ্টেন সিতারা বেগমও অনেকদিন ছিলেন বিস্মৃতির অন্ধকারে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে সহজেই অনুমেয়, ১৯৭১ সালে এবং পরবর্তী সময়ে প্রায় দুই দশকজুড়ে এ দেশে নারী মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় তেমনভাবে আলোচিত হয়নি। যে কারণে তারামন বিবির মতো একজন বীথিকা বিশ্বাস বা শিশির কণা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের গানবোট গ্রেনেড মেরে উড়িয়ে দিলেও যুদ্ধ-পরবর্তীকালে তারা যথাযোগ্য বীরের মহিমায় অভিসিক্ত হননি। উপরন্তু তাদের ললাটে জোটে সামাজিক লাঞ্ছনা। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে এমন উদাহরণ অসংখ্য।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃত অর্থেই ছিল জনযুদ্ধ। জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় জনযুদ্ধে মানুষ নানাভাবে অংশগ্রহণ করে। জাতির মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণটাই বড় কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের সবার বীর হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

তারামন বিবিদের মতো মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মা তখনই শান্তি পাবে যখন দেশে শুরু থেকেই তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হবে। তাদের আত্মত্যাগ নিয়ে আলোচনা হবে, পাঠ্যপুস্তকে তাদের বিস্তরভাবে মাহাত্ম্য তুলে ধরা হবে। আজ তারামন বিবির তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই সবার চাওয়া।

Link copied!