দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর নয়, লাগবে সালিশ পরিষদের অনুমতি

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর নয়, লাগবে সালিশ পরিষদের অনুমতি

দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির পরিবর্তে সালিশ পরিষদের অনুমতি নেওয়ার যে বিধান মুসলিম পারিবারিক আইনে রয়েছে, সেটিকে বৈধ ঘোষণা করেছে হাই কোর্ট। এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদন খারিজ করে আদালত রায় দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান চার বছর আগে এ রিট আবেদন করেছিলেন। তিনি মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক করার আবেদন জানান।

বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ গত বছরের আগস্টে রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়।

রায়ের ফলে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য সালিশ পরিষদ বা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বর্তমান বিধানই বহাল থাকছে বলে জানিয়েছেন রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান। 

 

ব্রিটিশ আমলে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৪ ধারায় বলা ছিল, স্ত্রী বা স্বামীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান থাকবে।

পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ স্পষ্ট করা হয়।

আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির একটি বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় সালিশ পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া পুনরায় বিয়ে করা যাবে না এবং অনুমতি ছাড়া সম্পন্ন কোনো বিয়ে নিবন্ধনযোগ্য হবে না।

এ বিধান অনুযায়ী, এক বা একাধিক স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরও বিয়ে করতে হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে নির্ধারিত ফি ও পদ্ধতিতে আবেদন করতে হয়। আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ, প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কিনা, তা উল্লেখ করতে হয়।

আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতিনিধি মনোনয়নের মাধ্যমে সালিশ পরিষদ গঠন করবেন। পরিষদ যদি মনে করে প্রস্তাবিত বিয়েটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত, তবে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিতে পারবে। সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করতে হবে।

অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সংশ্লিষ্ট পুরুষকে অবিলম্বে সব দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

 

২০২২ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। সেখানে তিনি মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা কেন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে মর্মে রুল চান।

পরবর্তীতে সম্পূরক আবেদনের মাধ্যমে তিনি রুলের ভাষা সংশোধন করেন, যেখানে বলা হয়—
‘বিদ্যমান বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের অনুমতি প্রদানের বর্তমান পদ্ধতি/প্রক্রিয়া, যা স্ত্রীদের মধ্যে সমান অধিকার নিশ্চিত করে না, তা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি হওয়ায় কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের পারিবারিক জীবনের অধিকতর সুরক্ষার স্বার্থে বহুবিবাহ আইন সংক্রান্ত বিষয়ে কেন নীতিমালা করা হবে না।’

চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাই কোর্ট রুল খারিজ করে দেয়।

রায়ে কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে আদালত বলেন, ‘এতে দেখা যায়, ইসলামী আইন বহুবিবাহের অনুমতি দিলেও, যেখানে কোনো পুরুষ দুই বা ততোধিক স্ত্রীর অধিকার ন্যায়সঙ্গতভাবে পালন করতে অক্ষম হওয়ার আশঙ্কা করেন, সেখানে “একজনকেই বিবাহ করার” বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

আদালত আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রযোজ্য হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত; তবে তা নির্ভরশীল একজন পুরুষের ন্যায়পরায়ণতা ও একাধিক স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতার ওপর।’

হাই কোর্টের মতে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারার অধীনে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়া ‘কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়’। আদালত বলেন,
‘এই আইন কোনো পক্ষের (পুরুষ ও নারী উভয়ের) অধিকার খর্ব করে না।’

সংবিধানের আলোকে আদালত আরও উল্লেখ করেন,
‘আমরা সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত সমতা ও বৈষম্যবিরোধী বিধানের আলোকে কোনো সাংবিধানিক বৈষম্য খুঁজে পাই না।’

 

আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘বহু বছর ধরে অনেকে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন যে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে। আসলে আইনের কোথাও প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি বাধ্যতামূলক আগে থেকেই ছিল না। আগে থেকেই ছিল, আরবিট্রেশন কাউন্সিল। গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে দেন। ফলে আইনের বিধানটি বহাল থাকল। অর্থাৎ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি পেলে তারপরে দ্বিতীয় বিয়ে; যেটি আগেও ছিল, এখনো সেটিই আছে।’

তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।

Link copied!