বুধবার ৬ জুলাই ২০২২
      Beta

রয়েছে চিরায়ত আবেদন, তবুও অবহেলিত নৃত্যশিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার ২৬ মে ২০২২ ০৯:৫৭:০০ অপরাহ্ন | আর্টস

শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে বহু শাখা-প্রশাখা বা ডালপালার যোগাযোগ রয়েছে। এই সংস্কৃতির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে সভ্যতার সূচনা। যার বাহন হচ্ছে কবিতা-সংগীত, চিত্র, ও নাচ। এর মধ্যে আবার প্রাচীনতম ধারা হলো নৃত্যকলা। মানুষের আবেগ প্রকাশ ও যোগাযোগের প্রাচীনতম বাহন। সভ্যতা সূচনার আদিমকাল থেকেই মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবিকার প্রণালিকে উপস্থাপনা করা হয়েছে নৃত্যের মধ্যদিয়ে। শুধু তাই নয়, মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি বিষয়কেই মূর্ত করে তুলে ধরা হয়েছে নৃত্যে। কখনো দেবদেবীকে তুষ্ট করতে, কখনো খরা-বৃষ্টি, রোগ-শোক, শিকার, যুদ্ধ-মানুষের জীবনে যা যা প্রকাশ ঘটেছে তার সবই নৃত্যের মধ্যদিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রখ্যাত সুফী সাধক জালাল উদ্দিন রুমীও তার গান নৃত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। নৃত্যের এই যোগাযোগজনিত ক্যানভাসটি এতটা বিশাল ও বৈচিত্র্যময় যে এর কোনো শেষ নেই। আন্তব্যক্তিক যোগাযোগ, আন্তঃযোগাযোগ ও গণযোগাযোগ মিলিয়ে এর ব্যাপ্তি সর্বব্যাপী। নৃত্যকলা অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ একটি শিল্পমাধ্যম। নৃত্য জীবনের কথা বলে, আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নারীমুক্তি আন্দোলন, মানবাধিকার অত্যন্ত সরবভাবে নৃত্যকলায় উঠে এসেছে। ফতোয়াবাজবিরোধী, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে নৃত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নৃত্যকলা যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, দেখলে মনে হবে এটা যেন ক্রমশ বিবর্ণ ও অস্বচ্ছ হয়ে পড়ছে। আগের সেই জৌলুস নেই। প্রতিদিনের প্রবাহে তো আছেই এমনকি আন্তর্জাতিক নৃত্যদিবসেও নানা অজুহাতে এর অনুষ্ঠান সীমিত হয়ে পড়ছে। নৃত্যের মধ্যদিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে অবিরাম গণযোগাযোগ ঘটে সেটা যেন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। নৃত্যশিল্পী ও দর্শকের মধ্যে যে রস ও ভাবের সঞ্চার হয় সেটার সুযোগ যেন ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে।

আগে মানুষ শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা করত আত্মা ও মনের খোরাকের জন্য, আর এখন বেশিরভাগই তা করছে আত্মপ্রচারের জন্য। এজন্য অবিভাভকরাও তাদের কোমলমতি সন্তানদের এই প্রচার মনস্কমনা থেকে সংস্কৃতির সেই মাধ্যমগুলোতেই দেওয়ার ব্যবস্থা করেন যেগুলোতে প্রচার আছে। অথচ বেশিরভাগ শিশুই মনের দিক থেকে প্রথমে নাচের প্রতিই আগ্রহী হয়। যারা কণ্ঠশিল্পী বা অভিনয় শিল্পী তাদের অনেকেই নাচ দিয়ে সংস্কৃতি চর্চার শুরু করেছেন। কিন্তু অবিভাবকরা এখন সেটার ব্যবস্থা না করে তাদের শিশু সন্তানদের সংস্কৃতির অন্য শাখাগুলোতে দেন। ব্যক্তিপর্যায়ে প্রচারের দিক থেকে অন্যসব মাধ্যমের তুলনায় নৃত্যশিল্পীরা যেন ব্যক্তি পর্যায়ে পিছিয়েই আছেন। কারণ, এটা দলীয় প্রদর্শনীর মাধ্যম। এতে যারা নেতৃত্ব দেন তারাই কিছুটা প্রচার পান। কিন্তু সবাই তো নেতৃত্ব দিতে পারেন না বা দেন না। বাংলাদেশে নব্বই দশকে যারা নৃত্যে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ কেড়েছেন তাদের মধ্যে মিনু হক, তামান্না রহমান, শিবলী মোহাম্মদ এবং শামীম আরা নীপা অন্যতম। এ ছাড়া সুলতানা হায়দার, আবদুস সামাদ পলাশ, দীপা খন্দকার, ফাতেমা কাশেম, স্বপন দাশ, কবিরুল ইসরাম রতন, সোহেল আরমান, মো. শরিফুল ইসলাম, আজিজুল ইসলাম প্রমুখ। তারা দেশে প্রচার পেয়েছেন তখন, যখন একটি মাত্র বিটিভি ছিল। এরপর দেশের প্রায় অর্ধশত বেসরকারি চ্যানেল হয়েছে কিন্তু তারপরও সেই বিটিভির তুলনায় পরবর্তী নৃত্যশিল্পীরা যেন প্রচারের আলো দেখতে পাচ্ছেন অনেক কম। এতেও বোঝায় দেশে নৃত্যশিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ কেমন। নয়তো দেশে যত বেসরকারি টিভি চ্যানেল আছে তাতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সময়ে চ্যানেলগুলোয় নৃত্য প্রচারের বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক হওয়ার কথা। কিন্তু নৃত্যশিল্পের সঙ্গে নিবেদিত এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে চ্যানেলগুলো এ বিষয়ে অনেকটাই উদাসীন। শিশুবিষয়ক নৃত্যকলার প্রচার কিছুটা হলেও বড়দের নিয়ে যে নৃত্যানুষ্ঠান করবে সে বিষয়ে মনোযোগ কম। 

অথচ বাংলাদেশ টেলিভিশন নৃত্যবিষয়ক অনুষ্ঠান 'ছন্দে আনন্দে' ও 'নৃত্যের তালে তালে' প্রচারের মাধ্যমে দেশব্যাপী নৃত্যচর্চার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। নৃত্যের এ চিরায়ত আবেদন সত্ত্বেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংস্কৃতির অন্যান্য বিষয় থাকলেও নৃত্যকে একটি পৃথক অনুষদ হিসেবে রাখা হয়নি। ১৯১৪ সালে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই সর্বপ্রথম বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি এবং গীতিনৃত্যের প্রাণ লায়লা হাসানের উদ্যোগে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যবিষয়ে একটি বিভাগ খোলা হয়। এরপর থেকে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও এই বিভাগ চালুর প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন তারা। এ বিষয়ে লায়লা হাসান বলেন, 'এ বিষয়ে প্রতিবারই আশ্বাস পাই সামনের বছরে হবে কিন্তু হচ্ছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নৃত্য বিভাগ চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। 

এখন এই অ্যাকাডেমিক পর্যায়েই যদি এমন অবস্থা হয় সেখানে চ্যানেলগুলো নৃত্যবিষয়ে কতটা আগ্রহী হবে? তারা ব্যবসায়ী, ব্যবসা ছাড়া কোনো কিছুরই প্রচারে যেতে রাজি নয় তারা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও কি এ নিয়ে ব্যবসায়ের কিছু আছে?' এক ছায়ানট আর বুলবুল ললিতকলা একাডেমি তো সবকিছুর দায়িত্ব নিতে পারে না। বাংলাদেশকে সভ্যতার আশীর্বাদপুষ্ট সংস্কৃতির লালন-পালন তারা অনেক করেছে এবং এখনো করে চলেছে। কিন্তু দেশের বেসকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর কি এ বিষয়ে কোনো দায়িত্ব থাকতে নেই! তারপরও প্রচারের মাধ্যমগুলোর দীনতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নৃত্য আগের তুলনায় অনেক এগিয়ে গেছে বলে মনে করেন ধৃতি নর্তনালয়ের প্রধান নৃত্যশিল্পী ওয়ার্দা রিহাব। তিনি বলেন, 'আমি বলব, বাংলাদেশে নাচের মান অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ নৃত্যের দিক থেকে, সংস্কৃতির দিক থেকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যায়ে চলে গেছে। আমরা এখন অনেক শিক্ষিত নৃত্যশিল্পী পাচ্ছি।