নারী মরদেহের পোস্টমর্টেম করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেসব হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
আজ (রোববার) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মো. মনির উদ্দিন। নারী মরদেহের পোস্টমর্টেমে গোপনীয়তা, মর্যাদা ও ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার স্বার্থে দেশের পোস্টমর্টেম করা হাসপাতালগুলোতে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন জনস্বার্থে এ রিট করেন। রিটে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।
এর আগে দেশের পোস্টমর্টেমকৃত হাসপাতালগুলোতে একজন করে মহিলা ডোম নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন করেছিলেন আইনজীবী মো. মনির উদ্দিন। তবে ওই আবেদনে সাড়া না পাওয়ার পর তিনি হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য পূর্ণ রাষ্ট্র। ইসলাম ধর্মসহ সব ধর্মের নারীর মৃতদেহ সতর বা পর্দার অন্তরালে রাখা বিধান রয়েছে। ময়নাতদন্ত একটি আইনি প্রক্রিয়া হলেও নারীর ক্ষেত্রে পর পুরুষের স্পর্শ বা উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, অতীতে পুরুষ কর্তৃক মৃত নারীর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে নারী ডোম থাকলে মৃত নারীর গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
রিট আবেদনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে কোনো নারী মারা গেলে তার পরিবার এমনিতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। এহেন পরিস্থিতিতে যখন জানতে পারে কোনো পুরুষ সদস্য তাদের পরিবারের প্রিয় নারী সদস্যের পোস্টমর্টেম করবে তাহলে তা হয় আরো হৃদয়বিদারক। যদি কোনো নারী ডোম তাদের কাজটি করতো তাহলে ওই দুঃসময়ে তারা একটু সান্ত্বনা পেতো।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সময়ে নারীরা সব ক্ষেত্রেই পুরুষের সঙ্গে কাজ করছেন। ময়না তদন্তের মতো জায়গায় নারী ডোম নিয়োগ করা হলে ধর্মীয় বিষয়টি রক্ষা হবে এবং বৈষম্যও কমবে।
এতে বলা হয়, আধুনিক সমাজের নারী রোগীদের বা মৃতদেহের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি যুগোপযোগী চাহিদা। মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী মৃত্যুর পরও একজন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নিশ্চিত করা জরুরি।
রিটে আরও অভিযোগ করা হয়, মর্গে অনেক সময় পুরুষ ডোমের মাধ্যমে মৃত নারীর শরীরে বিকৃত যৌনাচারের ঘটনা ঘটেছে।
আবেদনে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য রাখা এক তরুণীর মৃতদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। অভিযোগের পর মর্গের ডোম আবু সাঈদকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয় বলে আবেদনে বলা হয়।
এছাড়া ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে লাশের সঙ্গে যৌনাচারের অভিযোগে যতন কুমার পালের ভাগ্নে মুন্না ভগতকে (২০) গ্রেপ্তারের বিষয়টিও রিটে উল্লেখ করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তিনি নিজের দোষ স্বীকার করেছিলেন বলেও আবেদনে বলা হয়েছে।
রিট আবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি মর্গের রক্ষী কেনেট ডগলাসের ঘটনাও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, কেনেট ডগলাস (৬০) ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত রাতের শিফটে কাজ করার সময় মর্গে আসা ১০০টি নারী মরদেহের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের যেসব হাসপাতালে পোস্টমর্টেম করা হয়, সেসব হাসপাতালে একজন করে নারী ডোম নিয়োগ এবং নারী মরদেহের সম্ভ্রম রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।