জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহতের পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুলাই ১৯, ২০২৬, ০১:১১ পিএম

জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহতের পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা

ছবি: এপি

জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনার জবাবে রোববার ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই হামলার মাধ্যমে দুই দেশের সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন এক সপ্তাহ ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হামলায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধ বন্ধে করা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটিও ভেঙে পড়েছে।

গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সেতু, বিদ্যুৎ স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান কুয়েতের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টে হামলা চালায়, যা দেশটির স্বাভাবিক জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি হামলার পরিধি আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে তেহরান। এর পরই সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ অভিযানে ইরানের উপকূলীয় সামরিক নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, নৌ সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগারে হামলা চালানো হয়েছে।

সেন্টকম প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অভিযানে আইআরজিসিকেও সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত এই বাহিনী দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণও করে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, যুদ্ধবিমান এবং সমুদ্র থেকে নিক্ষেপ করা টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এসব হামলা চালানো হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি ছিল পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত একটি এলাকা। আইআরজিসি দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণ করে আসছে।

চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কী পরিমাণ সামরিক ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দেয়নি ইরান। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের এই সংঘাত এখন অষ্টম দিনে গড়িয়েছে। বিশ্বে সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানে একটি ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, একজন নিখোঁজ রয়েছেন এবং আরও চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে উপসাগরীয় প্রায় সব আরব দেশ। শনিবার সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্ক সংকেতও বাজানো হয়। তবে এখনো সংযুক্ত আরব আমিরাতে কোনো হামলা হয়নি।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ শনিবার এক প্রতিবেদনে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হুমকি দেয়। এক অজ্ঞাত কর্মকর্তার বরাত দিয়ে তারা জানায়, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে দুবাই ও আবুধাবির বিমানবন্দর এবং ফুজাইরাহ ও জেবেল আলি বন্দর দ্রুত খালি করে নিতে হবে।

এর জবাবে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলে, পরিস্থিতি যেন আরও সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার দিকে না যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামো ও স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালা ও বিধানের গুরুতর লঙ্ঘন এবং কোনো অবস্থাতেই তা গ্রহণযোগ্য বা ন্যায্য নয়।

যুদ্ধ চলাকালে তেহরানের হামলার জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ছয় সদস্যবিশিষ্ট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)-এর মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই ইরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে হুমকি দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলা চালানো হবে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো থেকে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করছে এবং প্রথম ধাপে প্রণালির উপকূলীয় এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আবারও নৌ অবরোধ আরোপ করেছে, যাতে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ব্যাহত হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এ পর্যন্ত পাঁচটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং একটি জাহাজ অচল করে দেওয়া হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি শনিবার এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ‘ভুলতে না পারা শিক্ষা’ দেবে।

এদিকে, ইরানের এক আলোচক জানিয়েছেন, প্রায় এক মাস আগে স্বাক্ষরিত এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে করা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার স্থগিত করেছে তেহরান।

ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘লোভ, দাদাগিরি, একচ্ছত্র আধিপত্য ও আগ্রাসনের’ জবাব হবে ‘বিধ্বংসী’।

Link copied!