আগস্ট ৩০, ২০২৫, ০৬:৪০ পিএম
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বারবার তথাকথিত ‘জঙ্গি তালিকা’ সরবরাহ করত এবং নির্দেশ দিত যেন তালিকাভুক্তদের কাউকে মুক্তি না দেওয়া হয়।
শনিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক “জবাবদিহিতার পথে: গুমের শিকারদের স্মরণে” শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে কমিশন অব ইনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস (সিআইইডি) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর)।
আসিফ নজরুল বলেন, “যখনই কাউকে মুক্তি দেওয়া হতো, নানা পক্ষ আমার কাছে এসে প্রশ্ন তুলত—‘কেন তাকে ছাড়া হলো, সে তো জঙ্গি।’ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আমাদের তালিকা দিত, যেখানে লেখা থাকত কাদের মুক্তি দেওয়া যাবে না। এর ফলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হতো, যাতে মামলাগুলো ঝুলে না থাকে।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গণপূর্ত উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সিআইইডি সদস্য নাবিলা ইদরিস এবং জাতিসংঘের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান।
ড. নজরুল জানান, ইতিমধ্যে ৯০ হাজারের বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট মামলার নির্বিচার প্রত্যাহার নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তার ভাষায়, “যাদের জঙ্গি বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে শতকরা ৫ থেকে ১০ জন হয়তো সত্যিই জঙ্গি ছিল, বাকিদের ওপর মিথ্যা মামলা দিয়েছিল আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন।”
তিনি আরও জানান, শুরুতে সন্ত্রাস ও হত্যা মামলাগুলো পরে পর্যালোচনা করার কথা ছিল, তবে এখন গুম কমিশন থেকে তালিকা পাওয়া মাত্রই প্রক্রিয়া শুরু হবে। “এখানে ভুল করলে চাপ বাড়বে—যদি একজন আসল জঙ্গি পর্যন্ত মুক্ত হয়ে যায়, তখন বলা হবে আমরা জঙ্গিদের ছেড়ে দিচ্ছি।”
আইনপ্রণয়নের প্রসঙ্গে ড. নজরুল বলেন, গুম প্রতিরোধে খসড়া আইন তড়িঘড়ি করে প্রণয়ন করা হয়েছে কেবল আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে। “এটি চূড়ান্ত খসড়া নয়। সব পক্ষের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো অনেক আইন নীতিগত অনুমোদনের পর মাসের পর মাস আলোচনার মধ্য দিয়ে হয়েছে।”
তিনি জানান, গুম কমিশনের প্রায় ৯০ শতাংশ সুপারিশ খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সবকিছুই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়।
“তবুও কিছু বিষয় গ্রহণ করা যেতে পারে, আমরা দায়িত্বশীল আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব,” যোগ করেন তিনি।
স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, “মানবাধিকার কমিশন বা গুম কমিশন যদি সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারে, তবে রাজনৈতিক প্রশাসনের অধীনে তা সম্ভব নয়। তাই আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাই।”
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, পৃথিবীতে খারাপ মানুষের সংখ্যা ভালো মানুষের চেয়ে বেশি, আর তারা অনেক বেশি সংগঠিত। ভালোরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়। গত এক বছরে এমন অনেক কিছু দেখেছি যা জীবনকে আরও জটিল মনে হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে আমি নিপীড়িত ও দমবন্ধ অনুভব করতাম, রাতেও ঘুম হতো না। কিন্তু মানুষ এতটা জটিল হতে পারে, তা আগে কল্পনা করিনি।”