ছয় মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ১২১

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৫, ০৪:৪১ পিএম

ছয় মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ১২১

ছবি: প্রতীকী

মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের (২০২৪) আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১২১ জন নিহত হয়েছেন।

আরেক মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে গণপিটুনিতে সর্বোচ্চ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে গত বছর। ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ১৪৬ জন, যা আগের বছরের প্রায় তিন গুণ। ২০২৩ সালে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন।

এ নিয়ে ‘গণপিটুনিতে ছয় মাসে ১২১ জন নিহত, আইন কী বলে’ শিরোনামে প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।  

এতে বলা হয়, মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গত ৫ আগস্টের পর ‘মব ভায়োলেন্স’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার পরিমাণ বেড়ে গেছে। সরকার তা বন্ধ করতে তেমন পদক্ষেপ নেয়নি। কখনো কখনো কাউকে জোর করে কোনো পদ থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ নানাভাবে ‘মবের’ সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এ কারণেই বেড়েছে এসব মবকেন্দ্রিক সহিংসতা বা গণপিটুনি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গণপিটুনির মতো এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে তিনটি কারণ আছে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথমত, এটি ঘটছে পরিকল্পিত উসকানির কারণে। সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তি এতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা একটা বড় কারণ। হয়তো ইচ্ছা করেই এ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। সর্বোপরি সরকারের উদাসীনতা ও কোনো পদক্ষেপ নিতে অনীহার কারণেই বেড়ে যাচ্ছে গণপিটুনির প্রবণতা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল মঙ্গলবার রাতে ঘটে গণপিটুনির দুটি ঘটনা। একটি রাজধানীর উত্তরায়, অন্যটি রাজধানী লাগোয়া গাজীপুরের টঙ্গীতে। দুটি ঘটনাতেই ‘ছিনতাইকারী’ সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে স্থানীয় লোকজন দলবদ্ধ হয়ে পেটানো শুরু করেন।

উত্তরায় ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে আহত করার পর পায়ে দড়ি বেঁধে পদচারীসেতুর সঙ্গে তাদের উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এই ব্যক্তিরা হলেন মো. নাজিম (৪০) ও মো. বকুল (৩০)।

রাত ১০টার দিকে উত্তরা হাউসবিল্ডিং এলাকার বিএনএস সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

উত্তরার ঘটনায় কারও প্রাণ যায়নি। কিন্তু টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে নিহত ওই যুবকের নাম-ঠিকানা জানাতে পারেনি পুলিশ।

দুটি ঘটনাই বীভৎস। আর এসব ঘটনা বা পিটুনির ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েও দেওয়া হয়। উত্তরার ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন এক ব্যক্তিকে ওপরে তুলছেন। তার পায়ে দড়ি বাঁধা। তাকে পদচারীসেতুর লোহার খুঁটির সঙ্গে উল্টো করে বাঁধছিলেন হলুদ রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক। আরও কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে ওপরে তুলছিলেন।

উত্তরা ও টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে অপরাধ বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের অতিষ্ঠ হয়ে পড়ার যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। পুলিশের তথ্য বলছে, ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার (ছিনতাই) ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪৫টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।

ডাকাতি ও দস্যুতা সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আরও বেড়েছে। দেশে গত জানুয়ারিতে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি (৬৯ শতাংশ)। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি (৭০ শতাংশ) বেশি।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অপরাধবিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়, অপরাধের শিকার হওয়ার আতঙ্ক থেকে মানুষ আইন হাতে তুলে নিতে পারে। সেটা ঠেকাতে অপরাধ দমাতে হবে। আবার যাঁরা আইন হাতে তুলে নেন, তাঁদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

গণপিটুনি আইনের দৃষ্টিতে ‘হত্যা’ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা হত্যাকারী হিসেবেই চিহ্নিত হন, এমনটাই মত দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। তার মতে, দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রশাসনে অস্থিতিশীলতা ও ভীতি এবং আমলাতন্ত্রকে পরিচালনায় অদক্ষতাই গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার কারণ।

শাহদীন মালিক বলছিলেন, ‘গণপিটুনি এখন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো প্রচেষ্টা সরকারিভাবে দেখছি না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের চাকরি ও বদলি নিয়ে তটস্থ। আমলাতন্ত্র পরিচালনাও যথাযথ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না যে প্রশাসনের যেসব অপরাধী আছে, তাদের বিচার করা যাবে না। কিন্তু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার এমন দুরাবস্থা থাকলে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়।’

Link copied!