রান্নার সময় গরুর মাংসের রং সবুজ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ জানা গেল ল্যাব রিপোর্টে

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

রান্নার সময় গরুর মাংসের রং সবুজ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ জানা গেল ল্যাব রিপোর্টে

ছবি: সংগৃহীত

রান্নার সময় গরুর মাংসের স্বাভাবিক লালচে রং বদলে নীলচে-সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় গত জুলাইয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল খুলনার পাইকগাছায়। মাংসটি নষ্ট ছিল কি না বা এতে ক্ষতিকর কোনো জীবাণু ছিল কি না এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পর কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। সম্প্রতি পাওয়া পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার পেছনে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা পচনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রাখা মাংস রান্নার আগে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় না এনে হঠাৎ বেশি তাপের সংস্পর্শে আসায় রং পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ২২ জুলাই। ওই দিন পাইকগাছা পৌর এলাকার মডার্ন বেকারির ২৫ কর্মচারী পিকনিকের আয়োজন করেন। এ জন্য সকালে তাঁরা পাইকগাছা বাজারের মাংস বিক্রেতা ইসমাইলের কাছ থেকে আগের দিন জবাই করা এবং রেফ্রিজারেটরে রাখা চার কেজি গরুর মাংস কেনেন।

বেকারিতে মাংস রান্না শুরু করার কিছুক্ষণ পরই এর রং বদলাতে শুরু করে। প্রথমে লালচে রং থেকে নীলচে-সবুজ হয়ে যায়, পরে তা আরও গাঢ় সবুজ দেখায়। বিষয়টি দেখে বেকারির কর্মীরা রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে প্রথমে বিক্রেতার দোকানে যান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও থানায় বিষয়টি জানান।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাংসের সবুজ হয়ে যাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে মাংসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি মাংস বিক্রেতার রেফ্রিজারেটরে থাকা প্রায় ৬০০ গ্রাম কাঁচা মাংসও সংগ্রহ করেন উপজেলা মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (স্যানিটারি ইন্সপেক্টর) উদয় কুমার মণ্ডল। ২৪ জুলাই কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা খুলনা জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্যবিশ্লেষণ শাখার ২৭ আগস্টের প্রতিবেদনে নমুনা পরীক্ষার ফল তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবরেটরিতে নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষায় মাংসে কোনো ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। রং তৈরিকারী পিগমেন্ট উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ারও অস্তিত্ব মেলেনি। এ ছাড়া নমুনায় পচা গন্ধ বা আঠালো ভাব পাওয়া যায়নি। ফলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা পচনের কারণে মাংসের রং বদলেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খুলনা জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান বলেন, গরুর মাংসের লালচে রং তৈরির অন্যতম উপাদান হলো মায়োগ্লোবিন। দীর্ঘ সময় রেফ্রিজারেটরে রাখা ঠান্ডা মাংস রান্নার আগে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ভালোভাবে না এনে সরাসরি অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে ওই উপাদানের পরিবর্তন হতে পারে। এর ফলে মাংসের রং লাল থেকে সবুজ হয়ে থাকতে পারে।

পরীক্ষার প্রতিবেদনে স্পেকট্রোফোটোমেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করেও একই ধরনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ফ্রিজে সংরক্ষণের পর উচ্চ তাপের সংস্পর্শে আসায় মাংসের মায়োগ্লোবিন বা হিম-রঞ্জক পদার্থের রাসায়নিক ও গাঠনিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলেই সবুজ রং দেখা দিয়ে থাকতে পারে।

তবে এটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। মোকলেছুর রহমান বলেন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা করা হয়েছে বলেই প্রতিবেদনে ‘ধারণা করা হচ্ছে’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, পরীক্ষার প্রতিবেদনটি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে এ নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি দূর করা যায়।

এদিকে মাংস বিক্রেতা ইসমাইল শুরু থেকেই মাংসে কোনো সমস্যা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর দাবি, একই গরুর মাংস থেকে অন্য ক্রেতাদের কাছেও মাংস বিক্রি করা হয়েছিল। তবে শুধু মডার্ন বেকারির কর্মীরাই মাংসের রং পরিবর্তনের অভিযোগ করেন।

সব মিলিয়ে পাইকগাছার আলোচিত ‘সবুজ মাংস’ নিয়ে পরীক্ষায় ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা পচনের প্রমাণ মেলেনি। আপাতত দীর্ঘ সময় ঠান্ডায় সংরক্ষণ এবং রান্নার সময় হঠাৎ অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে আসার কারণে মাংসের রঞ্জক পদার্থে পরিবর্তনকেই এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Link copied!