ছবি: রয়টার্স
প্রায় ছয় দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে নিজের অনন্য ক্যারিশমা, হৃদয়ছোঁয়া গান এবং অসাধারণ ব্যবসায়িক দক্ষতায় কোটি মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া কিংবদন্তি কান্ট্রি সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও অভিনেত্রী ডলি পার্টন মারা গেছেন। মঙ্গলবার ৮০ বছর বয়সে ন্যাশভিলে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি। তবে পার্টনের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ন্যাশভিলে শান্তিপূর্ণভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পিপল ম্যাগাজিন তাঁর প্রতিনিধিদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তারকা ‘স্বল্প সময়ের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই’ করছিলেন। মৃত্যুর কয়েক দিন আগেই পার্টন ম্যাগাজিনটিকে জানিয়েছিলেন, তিনি কিছু অনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে তখনও কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
তাঁর ভাতিজা ব্রায়ান সিভার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, তাঁর উদাহরণ দেখে আমরা বিশ্বাস করতাম, যেকোনো কিছুই সম্ভব। তিনি কখনো এমন কোনো দরজা দেখেননি, যা তিনি খুলতে পারেন না। আর তিনি যে দরজাগুলো খুলেছিলেন, সেগুলো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এবং ইতিহাস বদলে দিয়েছে।
‘কোট অব মেনি কালার্স’, ‘জোলিন’ এবং ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’-এর মতো কালজয়ী গানের মাধ্যমে পার্টন সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া নারী শিল্পীদের একজন হয়ে ওঠেন। তাঁর রেকর্ড বিক্রি হয়েছে ১০ কোটিরও বেশি। তিনি ১১টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন, যার মধ্যে রয়েছে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
প্রাণবন্ত ও সাদাসিধে ব্যক্তিত্ব, সুউচ্চ সোনালি চুলের সাজ, বর্ণিল পোশাক এবং মঞ্চজুড়ে তাঁর উচ্ছ্বাস পার্টনকে সব শ্রেণি-পেশার আমেরিকানের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। একই সঙ্গে কান্ট্রি সংগীতকে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে টেলিভিশনের বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং ব্যবসায়ও সফলতা অর্জন করেন পার্টন। নিজের অঙ্গরাজ্য টেনেসিতে তিনি গড়ে তোলেন ‘ডলিউড’ নামের থিম পার্ক, যা এখনো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। গীতিকার হিসেবেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
তবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের অসাধারণ ক্ষমতা। পার্টন নিজেকে যে পরিবারে ‘চরম দরিদ্র’ অবস্থায় বড় হয়েছেন বলে বর্ণনা করতেন, সেই শিকড় কখনো ভোলেননি। শ্রমজীবী আমেরিকানের প্রতীক হিসেবেও নিজেকে তুলে ধরেছেন তিনি। পাশাপাশি নিজের অর্থ ও পরিচিতি ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন গবেষণায় ১০ লাখ ডলার দান করেন পার্টন। এর মাধ্যমে মডার্নার ভ্যাকসিন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের অন্যতম অর্থদাতা হয়ে ওঠেন তিনি।
প্রি-স্কুল শিশুদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একটি সাক্ষরতা কর্মসূচিও পরিচালনা করেছেন পার্টন। পরে একই কর্মসূচি কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডেও চালু করা হয়। নিজের জন্মস্থান টেনেসির কাউন্টির উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিও দিয়েছেন তিনি।
পার্টনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ওই কাউন্টির আদালত ভবনের সামনে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ মূর্তি স্থাপন করা হয়। তবে ২০২১ সালে ন্যাশভিলে তাঁকে নিয়ে আরেকটি মূর্তি স্থাপনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। সে সময় পার্টন বলেছিলেন, বিশ্বে যা কিছু ঘটছে, তাতে এই মুহূর্তে আমাকে কোনো বেদিতে তুলে রাখা যথাযথ মনে করি না।
নিজের শিকড়ের প্রতি অবিচল থাকা, কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান—এই তিন বৈশিষ্ট্যই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত আমেরিকায় ডলি পার্টনের আবেদনকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
সূত্র: রয়টার্স