৯০০ দিনেও স্কুলে যেতে পারেনি সাড়ে ১৪ লাখ আফগান নারী শিক্ষার্থী

আহসান মুন্না

মার্চ ২৬, ২০২৪, ০৯:৩০ পিএম

৯০০ দিনেও স্কুলে যেতে পারেনি সাড়ে ১৪ লাখ আফগান নারী শিক্ষার্থী

ছবি: সংগৃহীত

২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, ১২ বছরেরও বেশি বয়সের নারী শিশুদের জন্য স্কুলের শিক্ষা বন্ধ করে দেয় আফগান সরকার।

এরপর পেরিয়ে গেছে ৯০০ দিনেরও বেশি সময়। এ পর্যন্ত স্কুল থেকে ছিটকে গেছে ১৪ লাখ নারী শিক্ষার্থী ও গত বুধবার শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে, অন্ধকারচ্ছন্ন ভবিষ্যতের মুখে পড়লো  ষষ্ঠ শ্রেণিতে পদার্পণের অপেক্ষায় থাকা আরও তিন লাখ ৩০ হাজার কন্যা শিশুর শিক্ষা জীবন, বলেছে জাতিসংঘের হিসাব।

২০২১ এর সেপ্টেম্বরে মার্কিন ও ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর সৈন্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার সময় দেশটির কট্টরপন্থী নতুন সরকার বলেছিলো, সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি তৈরির পর নারী শিক্ষা আবার ফিরিয়ে আনা হবে। ১৯৯০ সালে শরীয়া পরিপন্থী দাবি করে নারী শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া দেশটির সরকার বলেছিল, এবারে আইনশৃঙ্খলায় তারা শিথিল নিয়মকানুন আনবে।

অথচ নতুন শিক্ষাবর্ষ উপলক্ষ্যে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী হাবিবুল্লাহ আগার সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমাদের নারী সাংবাদিক বোনদের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান সংকুলানের অভাবে আমরা তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

শুধু শিক্ষায় নয়, নারীদের অবাধ বিচরণে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটির সরকার বাদবাকি শিক্ষার্থীদেরও ইসলামী ও আফগান সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ করেছে।

সেইসঙ্গে দেশটির বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিবর্তনমূলক উল্লেখ করে সেটিকে নারী পুরুষ উভয় শিক্ষার্থীর জন্য ক্ষতিকর বলেছে মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায় কট্টর পাঠ্যসূচি, নারীসহ তুলনামূলক যোগ্য শিক্ষকদের অপসারণ ও স্কুলগুলোতে কঠোর শাস্তির বিধান চালু হওয়ায় দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সৃষ্টি হয়েছে।

অথচ দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী আবুল সালাম হানিফি বলেছেন, তারা ‘দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে’ কাজ করে যাচ্ছেন।

বড় হয়ে পিএইচডি করতে ইচ্ছুক- এমন একজন কন্যা শিশু তার বেহাত হয়ে যাওয়া স্বপ্ন নিয়ে সংবাদ মাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানায়, ‘আমাদের শরীর হয়তো বেচে আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমাদের মন একদম মরে গেছে।’

অথচ ক্ষমতাসীন আফগান সরকার বারংবার আশ্বাস দিয়ে আসছে, ‘আর কিছুদিন সবুর করুন, শিক্ষা কাঠামোতে সংস্কার এলেই মেয়েদের স্কুলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে’ ও ‘অবশ্যই তা পরিপূর্ণ শরীয়া মোতাবেক হবে।’

কিন্তু গুমোট অপেক্ষার কাল যেন, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আর সেই হতাশার দীর্ঘশ্বাস উঠে এলো আরেকজন শিক্ষার্থীর কণ্ঠে, ‘আমার মনে হয় আমার স্বপ্নগুলো যেন অন্ধকার কোনো কুয়ায় আটকে আছে।’

আর সেই অন্ধকারকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে আফগান নারীদের ভবিষ্যতকে তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে হুড়হুড় করে বাড়তে থাকা বাল্যবিবাহ।

‘মেয়েদের বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হচ্ছে, সেইসঙ্গে বর্তমান আফগান সরকার, নির্যাতন থাকলেও কোনো বিয়েতে নারীদের জোরপূর্বক আটকে রাখার নিয়ম বানিয়ে, পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে’, বলেছেন অ্যামেনিস্টি ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক অধিকারকর্মী সামিরা হামিদি।

এর মধ্যে ২০২২ সালে ক্ষমতাসীন সরকার ঘোষণা দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও অংশগ্রহণ করতে পারবে না আফগান নারীরা। তার সঙ্গে পুরুষ আত্মীয় ছাড়া কোন নারীর একা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তাদের পোষাক পরিচ্ছদ ও কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত করে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করে কর্তৃপক্ষ। এমনকি একা একা পার্কেও যেতে পারবেন না দেশটির নারীরা, ঠাঁয় জানিয়ে দেয় দেশটির প্রশাসন।

নারী শিক্ষা বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলছে না, দেশটির বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের ঝোলায়, ইতোপূর্বে এমন মন্তব্য করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থানে অনড় দেশটির শীর্ষ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুনজাদার নেতৃত্বাধীন প্রশাসন।

আর অন্যদিকে ১৬ বছরের এক আফগান কন্যা শিশু বলছে, ‘আমরা মনে হয় মৃত লাশের মতো আফগানিস্তানে বাস করছি।’

Link copied!