চাকরির অনিশ্চয়তায় পিছিয়ে যাচ্ছে তরুণদের বিয়ে-সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা: ইউএনএফপিএ

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুলাই ১১, ২০২৬, ০১:৫২ পিএম

চাকরির অনিশ্চয়তায় পিছিয়ে যাচ্ছে তরুণদের বিয়ে-সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা: ইউএনএফপিএ

জরিপে উঠে এসেছে পরিবার গঠনের প্রবল আগ্রহ, তবে আর্থিক অস্থিরতাকে বড় বাধা বলছেন তরুণরা

বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী বিয়ে, পরিবার গঠন এবং সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তবে অনিশ্চিত চাকরি, আর্থিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এসব সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে বাধ্য করছে। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নতুন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন—আজ ও আগামীর জন্য’। ইউএনএফপিএ বলছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের সাফল্যের পর বাংলাদেশ এখন নতুন জনসংখ্যাগত বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

‘লাইভস, চয়েসেস অ্যান্ড ফিউচারস’ শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদনের জন্য বাংলাদেশসহ ৭৩টি দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী এক লাখ আট হাজারের বেশি মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা একজন জীবনসঙ্গী ও সন্তান—দুটোকেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তাদের আদর্শ জীবন পরিকল্পনায় বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, আর্থিক নিরাপত্তা ও স্থায়ী আয় ছাড়া পরিবার গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের জন্য কঠিন। অনেকেই বলেছেন, স্থায়ী চাকরি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে ইউএনএফপিএর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, তরুণদের পরিবার বা সন্তান নেওয়ার গুরুত্ব আলাদা করে বোঝাতে হয় না। তারা নিজেরাই পরিবারকে মূল্য দেন। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পর্যায় পেরিয়ে জনসংখ্যাগত সক্ষমতা কাজে লাগানোর নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে একজন নারীর গড়ে প্রায় সাতটি সন্তান জন্ম হতো, বর্তমানে তা কমে প্রায় ২ দশমিক ৪-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে মানুষের গড় আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বর্তমানে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে থাকায় বাংলাদেশ এখনো জনসংখ্যাগত সুবিধার (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) পর্যায়ে রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী নয়। পাশাপাশি জন্মহার কমে যাওয়া ও গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। তাই এখন থেকেই স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রবীণদের পরিচর্যার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

ইউএনএফপিএর মতে, জনসংখ্যাগত এই পরিবর্তনের সুফল পেতে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তরুণ নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত না করলে দেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। বাল্যবিয়ে, কিশোরী মাতৃত্ব, কর্মসংস্থানে বৈষম্য ও অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব এখনও নারীদের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের উন্নয়ন নির্ভর করবে দেশের তরুণ-তরুণীরা শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সমান সুযোগ কতটা পাচ্ছেন, তার ওপর।

Link copied!