আগস্ট ৩১, ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে শত শত মানুষের মৃত্যুর পর নেপালে উদ্ধার হওয়া মরদেহের দাফন শুরু হয়েছে। ভয়াবহ স্রোতে গ্রাম ও জনপদ ভেসে যাওয়ার পর এখনো হাজারো মানুষ নিখোঁজ থাকায় স্বজনদের উৎকণ্ঠাও কাটছে না। কেউ হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রে প্রিয়জনের খোঁজ করছেন, আবার কেউ ভিড় করছেন মর্গে মরদেহ শনাক্ত করতে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত বুধবার হিমালয় অঞ্চল থেকে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে এসে নেপাল ও চীনের তিব্বতের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত করে। এতে দুই দেশের মিলিয়ে অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রবল স্রোতে ভেসে কিছু মরদেহ ভারতের ভূখণ্ডেও পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখনো অন্তত ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রী যেমন রয়েছেন, তেমনি নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ শ্রমিকও রয়েছেন।
নিখোঁজদের উদ্ধারে দুর্গম এলাকাগুলোতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে নেপালি সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল। রোববার হিমালয়ের নদী উপত্যকার ত্রিশূলী-৩ এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে খননকাজ চালানো হয়। এর আগে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতর একটি পাইপ ঢোকাতে সক্ষম হন।
তবে টানা বৃষ্টি ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খনন করা এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় কিছু সময়ের জন্য অভিযান বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে আবার কাজ শুরু করেন উদ্ধারকারীরা।
দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী শ্রমিক সুরেন্দ্র দৌলুরি এএফপিকে বলেন, তিনি যে আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে কাজ করছিলেন, সেখানে হঠাৎ প্রচণ্ড পানির স্রোত ঢুকে পড়ে। একটি টারবাইন ফ্লোর কাদা ও পানিতে তলিয়ে যায়। সেখানে আটকা পড়া ছয় শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজনকে উদ্ধার করা গেলেও একজন মারা যান।
এদিকে বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় নেপালে সেগুলো সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণ নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় সংকট। পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কিছু মরদেহ দাফন শুরু করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে স্বজনদের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহ হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। এতে পরিবারগুলো নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ পাবে।
স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল ও মরদেহ শনাক্তকেন্দ্রে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি এলইডি স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে। ভয়াবহভাবে ক্ষতবিক্ষত মরদেহের ছবি দেখে অনেক স্বজনই চোখ বন্ধ করে ফেলছেন।
দুর্যোগের পেছনে হিমবাহ ধসকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। হিমবাহ ধসে পানি, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে এসে এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। প্রবল স্রোতে কয়েকটি বিশাল জলাধার বা হ্রদও তৈরি হয়েছে। এগুলো নতুন করে ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছেন উদ্ধারকারী ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তের একটি বন্দর এলাকায় ভূমিধসের পর নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় সেখানে উদ্ধারকাজে থাকা চীনা কর্মীদের রোববার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চীনের হিসাবে, তিব্বতে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে নেপালে রোববার পর্যন্ত ৭৮১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০২ জনে।
নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান এবং আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান চললেও নতুন করে বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধারকারীদেরও প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।