জুন ১৭, ২০২৬, ০১:০১ পিএম
ছবি: এপি
আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের স্থানীয় বাসিন্দা ও মূলত বাঙালি মুসলমানদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশব্যাক (ঠেলে দেওয়া) করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) এই জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়ার অবস্থানের কারণে দুই দেশের ‘জিরো লাইনে’ বেশ কিছু পরিবার আটকা পড়ে মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে বিএসএফের পক্ষ থেকে শিশুসহ ২০০-র বেশি মানুষকে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ঠেলে দেওয়ার অন্তত ২১টি চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে।
এদিকে গত মার্চের নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া শুভেন্দু অধিকারী বলেন, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত, বাতিল ও বহিষ্কার) নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ‘ফিরে যেতে বাধ্য করা’ হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, `আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠুরভাবে পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রেখে তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।`
তিনি আরও বলেন, `সরকারের উচিত বেআইনিভাবে মানুষকে বহিষ্কার করা বন্ধ করা, পদ্ধতিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা এবং মুসলমানদের প্রতি এই হতাশাজনক বিদ্বেষের অবসান ঘটানো।`
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্তত নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যারা দেখেছেন কীভাবে বিএসএফ রাতের আঁধারে দল বেঁধে মানুষকে সীমান্তে নিয়ে আসে এবং কাঁটাতারের বেড়া কেটে তাদের বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিজিবির বাধার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত এসব দলকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলায় ৫ জুন ঘটে যাওয়া এক ঘটনায় শিশুসহ ১০ জনকে পুশব্যাকের চেষ্টা করলে ৭৫ ঘণ্টার মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন বলেন, `দলটি বাংলাদেশ সীমানার প্রায় ৫০ ফুট ভেতরে চলে এসেছিল।` তিনি আরও বলেন, `স্থানীয়রা বিজিবিকে সতর্ক করে এবং বাহিনী পৌঁছানোর পর দলটি পিছু হটে নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেয়।`
তিনি জানান, প্রথম রাতে ওই দলটি ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে পড়ে এবং দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ তাদের কিছু শুকনো খাবার দেয়। পরে একাধিক ‘পতাকা বৈঠক’ ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত দলটিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
একইভাবে ৬ জুন ভোরে দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে তিন পুরুষ, দুই নারী ও একটি শিশুসহ ছয়জন ছিলেন। বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলেও বিএসএফ তাদের ভারতে ফেরত নেয়নি। পরে রাত কাটানোর পর তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
এছাড়া ৮ জুন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকে থাকার পর গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে ফেরত নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
প্রতিবেদনে ভারতের নাগরিকত্ব যাচাই ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াও উঠে আসে। বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের পর প্রায় ৯০ লাখের বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়, যা আটক ও বহিষ্কারের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, `আমরা তাদের সীমান্তের সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং আক্ষরিক অর্থেই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই।`
বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হাসিবুর ইসলাম জানান, শিলিগুড়ি থেকে আসা একটি পরিবারের আধার কার্ড থাকলেও ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় তাদের আটক করে সীমান্তে নেওয়া হয়। পরে তিন দিন আটকে থাকার পর পরিবারটিকে ভারতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা অবৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশিদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনে সহায়তা করছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, জোরপূর্বক বা ভয় দেখিয়ে কাউকে বহিষ্কার করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, পুশব্যাকের সময় সীমান্তরক্ষীরা অনেকের কাছ থেকে নথিপত্র, টাকা-পয়সা ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নিয়েছে।
বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা কোনো নাগরিককে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া গ্রহণ করবে না এবং দ্বিপক্ষীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রত্যাবাসন মেনে নেওয়া হবে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া আটক বা বহিষ্কার করা নিষিদ্ধ এবং সীমান্তে মানুষকে খাদ্য, পানি ও আশ্রয় ছাড়া ফেলে রাখা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ।
সংস্থাটির মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, `জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীদের দুটি লাইনের মাঝে খোলা মাঠে কাউকে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়।`
তিনি আরও বলেন, `ভারতের উচিত এই নির্মম বহিষ্কার বন্ধ করা এবং উভয় সরকারেরই নিশ্চিত করা উচিত যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যেন কখনোই মানুষের মৌলিক মর্যাদার বিনিময়ে না হয়।`