ইরানে হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তে উপসাগরীয় নেতাদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে: ট্রাম্প

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

আগস্ট ৩, ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

ইরানে হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তে উপসাগরীয় নেতাদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে: ট্রাম্প

ছবি: এপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতাদের জোরালো অনুরোধের পরই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

রোববার নিউ জার্সির বেডমিনস্টারে নিজের গলফ ক্লাবে সপ্তাহান্ত কাটিয়ে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে দিয়ে ‍‍`দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলা‍‍` চালানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে আলোচনা এবং ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তার অনুরোধের পর তিনি পরিকল্পনাটি বাতিল করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ট্রাম্প বলেন, আমি যুবরাজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনারা কী চান? আমরা হামলা চালাই, নাকি না চালাই?’ তারা বললেন, হামলার চেয়ে আমরা একটি সমঝোতাকেই বেশি গুরুত্ব দিই। কারণ এমন হামলা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা কেউ জানে না।

শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের ফোনালাপ হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতার ‍‍`মূল কাঠামোতে‍‍` পৌঁছেছে।

এর এক দিন আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তিনি ‍‍`আস্থা হারাতে শুরু করেছেন‍‍` এবং সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, মার্কিন বাহিনী ‍‍`খুব কঠোরভাবে আঘাত হানবে‍‍`।

রোববার ট্রাম্প আরও বলেন, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। একই সঙ্গে সম্ভাব্য এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগেরও সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে যুদ্ধ চলাকালে ইরান নিজেদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে।

রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‍‍`হরমুজ প্রণালি কোনোভাবেই ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।‍‍` তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রণালিতে নৌ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে আপাতত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না।

যুদ্ধ শুরুর পর একাধিকবার ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিলেও প্রতিবারই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয়।

এদিকে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় ইরান ‍‍`না বিস্মিত হয়েছে, না নিষ্ক্রিয় থেকেছে।‍‍` তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বাস্তব হুমকির বিরুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্র সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

একই সময়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রের ভেতরে মতপার্থক্য বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার বিরোধিতা করছে, অন্যপক্ষ মনে করছে সামরিক চাপকে কাজে লাগিয়ে আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

আলোচনায় ফেরার পথ খুলে দিতে পারে নতুন প্রস্তাব

ট্রাম্প জানান, তিনি আশা করছেন ‍‍`আগামীকাল বিকেলেই‍‍` আলোচনা আবার শুরু হবে। তবে এতে কারা অংশ নেবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

মধ্যস্থতাকারী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প যে প্রস্তাবের কথা বলেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পুনরায় আলোচনায় ফিরবে এবং এতদিন যেসব বিষয় সমঝোতার পথে বাধা হয়ে ছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, পুরো অঞ্চলে হামলা বন্ধ করা এবং ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের মাধ্যমে উপসাগরীয় আরব দেশ ও জর্ডানে হামলা বন্ধ করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং তেহরানকে আবারও তেল রপ্তানির সুযোগ দেবে। এসব বিষয় সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

ট্রাম্প আরও বলেন, জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতেই যুদ্ধের অবসান ঘটানোর উদ্যোগে ইসরায়েলও যুক্ত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

ইরানের পাল্টা হামলা নিয়ে সৌদির উদ্বেগ

শনিবারের ফোনালাপে সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র যদি সংঘাত আরও বাড়ায়, তাহলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি নিয়ে সৌদি আরব উদ্বিগ্ন।

ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত কিন্তু প্রকাশ্যে মন্তব্য করার অনুমতি নেই—এমন এক ব্যক্তি জানান, আলোচনা ছিল ‍‍`খোলামেলা ও ইতিবাচক‍‍`।

তিনি বলেন, যুবরাজ ট্রাম্পকে সতর্ক করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার জবাবে তেহরান যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তবে তার বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।

সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের ঘোষণার আগেই এই ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছিলেন সৌদি যুবরাজ।

ওই সূত্র আরও জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি আরব জানিয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার সম্ভাব্য ইরানি হামলা প্রতিরোধে যথেষ্ট সক্ষম। তবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের হামলার ক্ষেত্রে কুয়েত তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

ট্রাম্পও ইঙ্গিত দেন, সৌদি যুবরাজের সঙ্গে তার আলোচনাই ইরানে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, এটা তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত। তারা চাইছিল না আমরা এটা করি। আর সত্যি বলতে, সৌদি আরবও এটা চায়নি। তাদের বিশ্বাস ছিল, একটি সমঝোতা খুবই কাছাকাছি।

তথ্যসূত্র: এপি

Link copied!