জুলাই ৪, ২০২৬, ০৭:১৮ এএম
ছবি: এপি
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা কঠিন পরীক্ষায় পড়বে—ম্যাচের শুরুতে এমনটা হয়তো খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপ ভার্দে লিওনেল মেসিদের ১২০ মিনিটের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে রেখে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
ম্যাচের প্রথমার্ধে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার দখলে। তবে কেপ ভার্দের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ শুরুতে মেসিদের একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করে। ১৫ মিনিটে থিয়াগো আলমাদার পাস থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি লিওনেল মেসি। তিন মিনিট পর ফ্রি-কিক থেকেও গোলরক্ষক ভোজিনহাকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
অবশেষে ২৯ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। লিসান্দ্রো মার্টিনেজের নিখুঁত লং বল প্রথম স্পর্শেই নিয়ন্ত্রণে এনে কেপ ভার্দের রক্ষণ ভেঙে কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে জড়ান মেসি। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে তার সপ্তম গোল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার সরাসরি গোল অবদান দাঁড়ায় ১২টি (৬ গোল, ৬ অ্যাসিস্ট), যা ১৯৬৬ সালের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া টানা আটটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কৃতিত্বও গড়েন তিনি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা পৌঁছে ২০-এ।
গোলের পরও আর্জেন্টিনা আক্রমণের ধার বজায় রাখে। এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। ফলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় আলবিসেলেস্তেরা।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। কেপ ভার্দে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ৫৪ মিনিটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দুর্দান্ত সেভে গোল থেকে বঞ্চিত হয়। তবে ৫৯ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি আর্জেন্টিনার। ডান দিক থেকে রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাক পেয়ে ডেরয় দুয়ার্তে কঠিন কোণ থেকেও শক্তিশালী শটে বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান।
সমতায় ফেরার পর একের পর এক আক্রমণ চালায় আর্জেন্টিনা। ৬২ মিনিটে লওতারো মার্টিনেজের পাস থেকে মেসির নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দেন ভোজিনহা। ৭২ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিকও কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। শেষদিকে মেসির আরও দুটি প্রচেষ্টা, পারেদেসের দূরপাল্লার শট এবং ম্যাক অ্যালিস্টারের সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ফলে নির্ধারিত সময় শেষ হয় ১-১ সমতায়।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবার এগিয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ফ্লিকের পর লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ পায়ের শক্তিশালী শটে জালের ছাদে পাঠিয়ে স্কোরলাইন ২-১ করেন। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে অতিরিক্ত সময়ে হওয়া তৃতীয় দ্রুততম গোল।
তবে কেপ ভার্দে আবারও ম্যাচে ফিরে আসে। ১০৩ মিনিটে সিডনি লোপেজ ক্যাবরাল বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে দূরের কোণায় দুর্দান্ত বাঁকানো শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে স্কোর ২-২ করেন। গোলটি টুর্নামেন্টসেরার দাবিদার বলেই মনে হচ্ছে।
ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ১১১ মিনিটে আসে ভাগ্য নির্ধারণী মুহূর্ত। মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড ডিনে বোর্জেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। আত্মঘাতী গোল হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া এই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
শেষ মুহূর্তে কেপ ভার্দে আরও একবার সমতায় ফেরার দারুণ সুযোগ তৈরি করেছিল। ১১৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে সিডনি ক্যাবরালের নেওয়া দুর্দান্ত ফ্রি-কিক জালের কোণায় ঢুকে যাচ্ছিল, কিন্তু এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অসাধারণ ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে বল ফিরিয়ে দেন। সেটিই ছিল ম্যাচের শেষ বড় সুযোগ।
পুরো ম্যাচে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা ছিলেন অন্যতম সেরা পারফরমার। তিনি মোট আটটি সেভ করে আর্জেন্টিনার একাধিক নিশ্চিত গোল ঠেকান। অন্যদিকে মেসি একাই পাঁচটি শট অন টার্গেটে রাখলেও জয় নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে ভরসা করতে হয় প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোলের ওপর।
শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করলেও এই ম্যাচে কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা শুধু চমক দেখাতে আসেনি; বরং যেকোনো পরাশক্তির জন্যই তারা হতে পারে কঠিন ও ভয়ংকর প্রতিপক্ষ।