অর্থবিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস

অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক

জুন ২৯, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম

অর্থবিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদে অর্থবিল–২০২৬ সংশোধনীসহ পাস হয়েছে। এতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন নম্বর বাধ্যতামূলক না রাখার বিধান রাখা হয়েছে।

আজ (সোমবার) বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি চূড়ান্ত পাসের জন্য উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়।

বিলটি পাসের আগে এর ওপর সংসদ সদস্যদের আনা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব এবং সাধারণ নীতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ কয়েকজন সদস্য বিশাল ঘাটতি বাজেট, কর ও ভ্যাটের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা এবং প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর থেকে ঋণের আশ্বাসের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বিলটি অধিকতর যাচাইয়ের দাবি জানান।

আলোচনা শেষে একাধিক সংশোধনীসহ বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হয়।

বিল পাসের পর বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার একটি চরম দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তিনি বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ আশাবাদী। চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক না কেন, কার্যকর নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সব ধরনের বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার এখন ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ, নতুন উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানই হবে প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁর মতে, উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছানো এবং মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়নই সরকারের লক্ষ্য।

বাজেট বিষয়ে সংসদ সদস্যদের দীর্ঘ ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, তাঁদের মতামত জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তিনি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সমালোচনাকেও স্বাগত জানান এবং বলেন, বাজেট কেবল আয়–ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা।

মুদ্রাস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে কারসাজি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি চাপে পড়েছে। তবে কৃষি, শিল্প, সেবা ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতা এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে।

উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার করহার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ করবে। স্বচ্ছতা বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রস্তাবিত একক ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ছোট মুদি দোকানগুলোকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হবে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় হবে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

পূর্ববর্তী সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকারের মোট ঋণ প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, এই ঋণের চাপ বর্তমান সরকারের ওপর বড় আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে।

ঋণ নির্ভরতা কমাতে ব্যাংকঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং বন্ড ও ইকুইটি ফাইনান্সিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশ–বিদেশে মোট ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে।

তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ–সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।

এছাড়া ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ১৫টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

Link copied!