আগস্ট ২৩, ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরিচিত ওই দুই যুবক পরিকল্পিতভাবে চারজনকে হত্যা করে। পরে ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
আটক দুজন হলেন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। রোববার ভোরে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। তাদের বাড়ি নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছেই। মুগ্ধ নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন। আর সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারি দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির তৃতীয় তলার ছাদে ওঠেন। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের সেখানে বসার কারণ জানতে চান এবং মাদক সেবনে বাধা দেন।
পুলিশের ভাষ্য, পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ওই দুই যুবক গণপতির গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন। তার চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাকেও হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ছাদে উঠতে গেলে তাকেও হত্যা করা হয়।
পরে বাসায় ঢুকে ঘুমিয়ে থাকা ১৩ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে এবং বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত পরিবারের সঙ্গে আটক দুই যুবকের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
হত্যার পরও ওই বাড়িতে বেশ কিছু সময় অবস্থান করেন দুই যুবক। পুলিশের দাবি, তারা সেখানে গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে আলমারি ও ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। এভাবেই ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করা হয় বলে পুলিশের ধারণা।
তদন্তে ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, কামড়ানো শসা ও খেজুরের বিচি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। এসব আলামত থেকে পুলিশের ধারণা হয়, স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ স্থানীয় কেউ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
পুলিশ জানায়, ঘরে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে। উদ্ধার করা খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত পরিবারের লুট হওয়া স্বর্ণালংকার একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গণপতি চক্রবর্তী পরিবার নিয়ে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। ভবনের প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ তখনো অসম্পূর্ণ ছিল।
স্বজনদের বরাতে পুলিশ জানায়, দুদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। শনিবার রাতে গণপতির শ্যালিকা বাড়িতে গিয়ে দরজা তালাবদ্ধ দেখতে পান। জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর এলোমেলো অবস্থা দেখে সন্দেহ হলে স্থানীয়দের জানান। পরে পুলিশ গিয়ে তালা ভেঙে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক। অবসর নেওয়ার পর তিনি নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানান, এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আটক দুজনকে আদালতে পাঠিয়ে তাদের জবানবন্দি নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে চারজনকে হত্যার প্রতিবাদে রোববার দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন। তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।