সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘের সংখ্যা, কাটেনি অস্তিত্বের শঙ্কা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘের সংখ্যা, কাটেনি অস্তিত্বের শঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত

আজ ২৯ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’। বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হয়।

দিবসটি উপলক্ষে আজ (বুধবার) ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে এবং সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে স্থানীয়দের অংশগ্রহণে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

সুন্দরবনে কেমন আছে বাঘ

দেশে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবনে একসময় চার শতাধিক বাঘ ছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের বাঘ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি।

এর আগে ২০১৫ সালের বাঘশুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালের জরিপে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের জরিপে আগের তুলনায় বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১১টি। একই জরিপে ২১টি বাঘশাবকের ছবিও পাওয়া গেছে।

তবে সুন্দরবনের ভেতরে থাকা পাঁচটি বড় নদীর কারণে পূর্ব-পশ্চিমে বাঘের চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। পাশাপাশি চোরাশিকারিদের তৎপরতা, খাদ্যসংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় বাঘের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে বাঘের দেহে জিনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কমছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা।

গত দুই দশকে সুন্দরবনে বাঘের টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়েছে। চোরাশিকারিদের তৎপরতা এবং হরিণ শিকারের কারণে খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যোগ হয়ে বাঘের আবাসস্থলও সংকুচিত হচ্ছে।

সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে নেওয়া পদক্ষেপ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঘসহ বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য সুন্দরবনের ২০টি স্থানে মাটির উঁচু টিলাসহ (কেল্লা) আশ্রয়স্থল তৈরি করা হয়েছে। বন্যপ্রাণীদের সুপেয় পানির জন্য খনন করা হয়েছে পুকুর।

বাঘ যাতে লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়া। বন্যপ্রাণী শিকারের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন ২৫টি হটস্পট চিহ্নিত করে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বাঘের প্রজনন মৌসুমে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক এবং জেলে-বাওয়ালিদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হচ্ছে।

বাঘ রক্ষায় আইন

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ জারি করা হয়। এর মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

পরবর্তীতে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন সংশোধন করে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। এর ফলে বন বিভাগ আইনি ভিত্তিতে বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা শুরু করে।

থেমে নেই বাঘের মৃত্যু

আইন কঠোর হলেও দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব, খাদ্যের সন্ধান এবং প্রাকৃতিক নানা কারণে বাঘ মারা পড়েছে। গত ২৪ বছরে সুন্দরবনে ৩০টিসহ মোট ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।

এর মধ্যে পাচারকারী ও চোরাশিকারিদের হাতে নিহত হয়েছে ২৬টি বাঘ। লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় গ্রামবাসীর পিটুনিতে মারা গেছে ১৪টি, বনদস্যুদের হাতে প্রাণ গেছে ১৮টির। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে তিনটি বাঘ।

এ ছাড়া বাঘের চামড়া উদ্ধারের মাধ্যমে আরও অনেক বাঘ হত্যা ও পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও এসব ঘটনার তথ্য বন বিভাগের কাছে নেই।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী। তবে আশার বিষয় হলো, ২০২৪ সালের পর সুন্দরবনে আর কোনো বাঘ মারা পড়েনি।

বন বিভাগের বক্তব্য

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সুন্দরবনের বাঘ বেশি নিরাপদ। ২০২৪ সালের পর সুন্দরবনে আর কোনো বাঘ মারা পড়েনি।

তিনি বলেন, বাঘের আবাসস্থল নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। চোরাশিকারিদের আটক, ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রলিং এবং প্রতিদিন পায়ে হেঁটে টহল কার্যক্রম চালু রয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন স্থানে মাটির উঁচু টিলাসহ (কেল্লা) আশ্রয়স্থল তৈরি করা হয়েছে। বন্যপ্রাণীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে পুকুর খনন করা হয়েছে।

বাঘের নিরাপত্তায় লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে ৭৫ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ, ২৫টি হটস্পটে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে নজরদারি এবং প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে পর্যটক ও জেলে-বাওয়ালিদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

Link copied!