আগস্ট ১৭, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
স্মার্টফোন এখন শুধু বড়দের হাতে সীমাবদ্ধ নেই। পড়াশোনা, গেম কিংবা কার্টুন দেখার জন্য অনেক শিশুর হাতেও নিয়মিত থাকছে মোবাইল ফোন। বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে গিয়ে কেউ কেউ ঢুকে পড়ছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আবার অনেক শিশুর নামে আলাদা অ্যাকাউন্টও খুলে দেওয়া হচ্ছে।
ফলে বয়সের কথা না ভেবেই অল্প বয়সে নানা ধরনের কনটেন্ট দেখার সুযোগ পাচ্ছে তারা। এসব প্ল্যাটফর্মে ভালো কনটেন্ট যেমন আছে, তেমনি আছে সহিংসতা, অশালীনতা, সাইবার বুলিং, আত্মক্ষতির প্ররোচনা কিংবা শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরির মতো বিষয়। শিশু এসবের কোনটা দেখবে আর কোনটা এড়িয়ে চলবে, তা সবসময় বুঝে উঠতে পারে না।
শুধু দর্শক হিসেবেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরিতেও এখন শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় করা যায় এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই সন্তানকে নিয়ে ভিডিও বানাচ্ছেন। শিশুর কথা বলা, দুষ্টুমি, পোশাক, পারিবারিক ঘটনা কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তও কখনো ভিডিওর বিষয় হয়ে উঠছে।
একটি ভিডিও বেশি মানুষ দেখল, বেশি লাইক বা শেয়ার হলো এটাই অনেকের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু এতে শিশুটির কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, সেটি অনেক সময় ভাবা হচ্ছে না। একটি শিশুর ছবি বা ভিডিও একবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে সেটি কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, কে সংরক্ষণ করবে বা ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করবে, তার ওপর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
এখানেই বড় প্রশ্নটি আসে শিশুর অনলাইন উপস্থিতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও উদ্বেগ বাড়ছে। কোথাও বয়সের সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে, কোথাও অভিভাবকের অনুমতির বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন করা হয়েছে। আরও কয়েকটি দেশেও শিশুদের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝুঁকি শুধু বয়স-অনুপযোগী ভিডিও দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, অতিরিক্ত স্ক্রিনে আসক্তি কিংবা শরীর ও চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। কিছু কনটেন্ট শিশুকে নিজের শরীর, খাবার বা জীবন নিয়ে ক্ষতিকর ধারণার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবে এসব ঝুঁকি এড়াতে শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়াই সবসময় সমাধান নয়। বরং সে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে এবং কোনো সমস্যায় পড়লে কার কাছে যাবে এসব বিষয়ে শুরু থেকেই তাকে বোঝানো দরকার।
শিশু কোনো অস্বস্তিকর ভিডিও বা ছবি দেখে ফেললে প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাকে বকাঝকা না করা। ভয় পেলে শিশু পরেরবার বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে পারে। বরং শান্তভাবে জানতে হবে, সে কী দেখেছে এবং বিষয়টি তাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে।
মোবাইল ব্যবহারেরও কিছু নিয়ম থাকতে পারে। পড়ার সময়, খাওয়ার সময় কিংবা ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার না করার অভ্যাস করা যায়। বয়স অনুযায়ী প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ও প্রাইভেসি সেটিংস চালু রাখাও কাজে আসতে পারে।
শিশুকে নিজের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত ছবি অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার না করার বিষয়টি বোঝানো দরকার। কেউ অনলাইনে বিরক্ত করলে, ভয় দেখালে বা অস্বস্তিকর কিছু চাইলে যেন সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মাকে জানায়, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর জীবনে মোবাইলের বাইরে আনন্দের জায়গা থাকতে হবে। খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, গান, ঘুরতে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ যত বাড়বে, ফোনের ওপর নির্ভরতা ততটা কমানো সম্ভব।
প্রযুক্তি এখন শিশুদের জীবন থেকে আলাদা করে রাখার মতো কোনো বিষয় নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতার সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জনপ্রিয়তা বা আয় করার আশায় যেন শিশুর ব্যক্তিগত জীবন এবং স্বাভাবিক শৈশবকে পণ্যে পরিণত না করা হয়।
শিশুর হাতে মোবাইল দেওয়া হয়তো সহজ। কিন্তু সেই মোবাইলের ভেতরের দুনিয়ায় তাকে কীভাবে নিরাপদে চলতে হবে, সেটাই বড় দায়িত্ব।