মে ১০, ২০২৬, ১১:৪০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।
শনিবার (৯ মে) দিবাগত গভীর রাতে সরকারি তৎপরতা ও জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিহতদের মরদেহ তাদের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়। গভীর রাতে ফ্রিজিং ভ্যানে করে মরদেহগুলো গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলে উপস্থিত অনেকেই প্রশাসনের এই মানবিক ভূমিকা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শোকের কঠিন সময়ে জেলা প্রশাসনের দ্রুত ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে।
ঘটনার পর শনিবার সকালেই প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন, কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক এবং জেলা প্রশাসনের দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে যান। তারা শোকাহত পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন এবং ঘটনার ভয়াবহতায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েন।
জেলা প্রশাসক মানবিক বিবেচনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সাধারণত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেলা ২টার পর ময়নাতদন্ত করা হয় না। তবে মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ার আশঙ্কা এবং ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তিনি রাতেই পাঁচটি মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেন।
ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবহনে বৃষ্টিজনিত সমস্যা এড়াতে তিনি ফ্রিজিং ভ্যানের ব্যবস্থা করেন। প্রথমে পিকআপ ভ্যানে মরদেহ পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘ পথ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পরে দুটি ফ্রিজিং ভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়।
এছাড়া দাফন ও পরিবহনসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যয় জেলা প্রশাসকের তদারকিতে বহনের ব্যবস্থা করা হয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘মানুষ চলে গেলেও তার মরদেহের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
নিহতরা হলেন গোপালগঞ্জ জেলার পাইককান্দি গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত মোল্লার মেয়ে শারমিন খানম (৩৫), তার ভাই রসুল (২২) এবং শারমিন-ফোরকান দম্পতির তিন কন্যা মিম (১৬), মারিয়া (৮) ও ফারিয়া (২)। পুলিশের ধারণা, শারমিনের স্বামী ফোরকান এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন।
শনিবার ভোরে কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা (পূর্ব পাড়া) গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে ফোরকানের স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান পলাতক থাকলেও তিনি মুঠোফোনে স্বজনদের কাছে খুনের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
স্বজনদের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান মিয়া তার ভাই মিশকাতকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না’। ফোরকান পেশায় গাড়িচালক ছিলেন এবং গত পাঁচ বছর ধরে ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
নিহত শারমিনের ভাই শাহীন মোল্লা জানান, গত শুক্রবার সকালে ফোরকান তার ছোট ভাই রসুলকে ফোন করে রাজেন্দ্রপুরের একটি পোশাক কারখানায় সাড়ে ১৯ হাজার টাকা বেতনে চাকরির ব্যবস্থা হওয়ার কথা জানান। সেই আশ্বাসে রসুল শুক্রবার সন্ধ্যায় বোনের বাসায় আসেন। শারমিনের এক ফুপু বলেন, রসুল অন্য জায়গায় চাকরি করতেন, কিন্তু নতুন চাকরির কথা বলে ফোরকান তাকে ডেকে এনে হত্যা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ প্রতিটি মরদেহের ওপর কম্পিউটারে টাইপ করা একটি করে লিখিত অভিযোগপত্র উদ্ধার করে। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসিকে উদ্দেশ্য করে লেখা ওই অভিযোগে ফোরকান তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়া এবং তার উপার্জিত ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে বাবার বাড়িতে জমি কেনার অভিযোগ তোলেন। এছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ৩ মে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে হাত-পা বেঁধে মারধর করেছিলেন। তবে শারমিনের স্বজনরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নিহত শারমিনের আরেক ফুপুর দাবি, ফোরকান আরেকটি বিয়ে করার কথা স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, যা নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝগড়া চলছিল। ছয়-সাত মাস আগে ফোরকান শারমিনকে এমনভাবে মারধর করেছিলেন যে তাকে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। এমনকি ফোরকান আগে থেকেই পাসপোর্ট করে রেখেছিলেন এবং শনিবারই তার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল বলে স্বজনরা আশঙ্কা করছেন।
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, পারিবারিক কলহের জেরে ফোরকান এ ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন। প্রতিটি লাশের ওপর অভিযোগের কপি রাখা ছিল। বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।’