ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব কেবল আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। সংসদ কার্যক্রমের পাশাপাশি নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ, প্রশাসনিক সমন্বয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে হয় তাঁদের। এই বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালনে সহায়তার জন্য রাষ্ট্র নির্ধারিত একটি বেতন–ভাতা ও সুবিধার কাঠামো চালু রয়েছে।
এই কাঠামোর আইনি ভিত্তি হলো ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’, যা সময়ের সঙ্গে সংশোধন ও হালনাগাদ হয়েছে। বর্তমান বিধান অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য যেসব সুবিধা পান, তার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
মাসিক সম্মানী ও নির্বাচনী এলাকা ভাতা
সংসদ সদস্যরা মাসিক সম্মানী হিসেবে পান ৫৫ হাজার টাকা। এটি তাঁদের মূল পারিশ্রমিক। নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কাজ চালাতে মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনী এলাকা ভাতা দেওয়া হয়।
আপ্যায়ন ভাতা
অতিথি আপ্যায়ন ও সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারিত রয়েছে মাসিক ৫ হাজার টাকা।
শুল্কমুক্ত গাড়ি ও পরিবহন ভাতা
পরিবহন খাতে এমপিরা উল্লেখযোগ্য সুবিধা পান। দায়িত্বকালীন সময়ে একটি গাড়ি—জিপ বা মাইক্রোবাস—শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য আমদানি ফি ছাড়াই আনার সুযোগ রয়েছে। পাঁচ বছর পর একই সুবিধায় আরেকটি গাড়ি আমদানি করা যায়। পাশাপাশি জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের বেতন মিলিয়ে মাসিক ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা দেওয়া হয়।
ভ্রমণ ভাতা
ভ্রমণের ক্ষেত্রেও এমপিরা বিশেষ সুবিধা পান। সংসদ অধিবেশন বা কমিটির বৈঠকে অংশ নিতে বিমান, রেল বা জাহাজে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ পর্যন্ত ভাতা পাওয়া যায়। সড়কপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারিত।
দেশের ভেতরে ভ্রমণের জন্য বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাতা বা সমপরিমাণের ট্রাভেল পাসের সুবিধা রয়েছে।
অফিস ব্যয় ভাতা
নির্বাচনী এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকে।
লন্ড্রি ও আনুষঙ্গিক ভাতা
দৈনন্দিন আনুষঙ্গিক ব্যয়ের মধ্যে লন্ড্রি বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং রান্নার সরঞ্জাম, লিনেন ও টয়লেট্রিজসহ অন্যান্য খরচের জন্য ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
দৈনিক ভাতা
দায়িত্বস্থলে অবস্থান করলে সংসদ সদস্যরা প্রতিদিন ৭৫০ টাকা দৈনিক ভাতা পান। সংসদ অধিবেশন বা সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকলে দৈনিক ভাতা ৮০০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা ২০০ টাকা প্রাপ্য হয়।
চিকিৎসা সুবিধা
চিকিৎসা খাতে সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবার প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা পান, সঙ্গে মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা।
টেলিফোন সুবিধা
বাসভবনে সরকারি টেলিফোন সংযোগের পাশাপাশি কল ও ভাড়া বাবদ মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা দেওয়া হয়।
বীমা সুবিধা
দায়িত্বকালীন দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা প্রযোজ্য।
করমুক্ত ঐচ্ছিক অনুদান
জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা ঐচ্ছিক অনুদানও বরাদ্দ থাকে। এসব ভাতা ও সুবিধা আয়করমুক্ত।
রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, এই সুবিধাগুলোর লক্ষ্য হলো সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা এবং নির্বাচনী এলাকায় কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ভাতা–সুবিধার যৌক্তিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা চলছেই। অনেকের প্রশ্ন—এই সুবিধার বিনিময়ে জনসেবার মান ও দায়বদ্ধতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে।