‘তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ?’— আত্মহত্যার আগে ফেসবুক পোস্টে পুলিশ কনস্টেবল

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

‘তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ?’— আত্মহত্যার আগে ফেসবুক পোস্টে পুলিশ কনস্টেবল

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনস ভবন থেকে মো. সাইদুল ইসলাম (২১) নামে এক পুলিশ কনস্টেবলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, হতাশা থেকে গলায় ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। 

আজ (শুক্রবার) সকালে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত সাইদুল ইসলাম ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. সাদেকের ছেলে। তিনি প্রায় ৯ মাস আগে বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল পদে যোগ দেন।

মৃত্যুর আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি দীর্ঘ পোস্টে হতাশা, কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন সাইদুল। পোস্টে তিনি একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কষ্টের কথা উল্লেখ করেন।

সাইদুল তার পোস্টে লিখেন, ‘তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম একটু একটু করে, হঠাৎ যেন সে জগৎটাকে দুইদিনেই চোখের সামনে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিলে। আমি সবকিছু চুপচাপ দেখে গেলাম। সমুদ্রের মাঝখানে তরী ডোবা মানুষ অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর যেমন কুলের দেখা না পেয়ে শেষমেশ নিয়তিকে মেনে নেয়, সাদরে গ্রহণ করে মৃত্যুকে, তেমনি আমারও যেন কিছুই করার নেই। কত তুচ্ছ বাহানা দিয়ে মানুষ একটা গভীরতম সম্পর্কের ইতি টানে, আমি অবাক হই, মানুষ আসলেই কী মানুষকে ভালোবাসে..?’

তিনি আরও লিখেন, ‘জানো.? মাঝে মাঝে কেন জানি নিজেকে দেখলে নিজের অনেক মায়া লাগে, হাহাকার লাগে কি হয়ে গেলাম কি বানাইয়া গেলা, আচ্ছা বলতো আমার দোষটা কী ছিল.? কি করছিলাম আমি.? তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ? নাকি সব কিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ.? তুমি না বলছিলা মৃত্যু ছাড়া তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না। এখন কই তুমি? আমিতো তোমার অভাবেই শেষ হয়ে গেলাম, অনেকবারই তো আঘাত করছো সব ভুলে বার বার মাফ করে তোমাকে বুকে টেনে নিলাম এই মূল্য দিলা.? একেবারেই শেষ করে দিতে আসলা? আমি তো নিয়তি মেনে নিয়ে দূরেই ছিলাম তোমার থেকে, কেন আবার আসছিলা কেন এত কাছে আসছিলা? কোনো উত্তর খুঁজে পাই না আমি। শুধু দ্বিতীয়বার না, তৃতীয়বার না, চতুর্থবার না, আমি হাজার বার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু তুমি প্রতিবারই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছো মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয় না। যে বিশ্বাস করলে নিজেই আর বাঁচার সুযোগ থাকে না।’

নিজের সম্পর্কের বিষয়ে সাইদুল পোস্টে লিখেন, হারিয়ে ফেলতে চাইনি বলেই তাদের সম্পর্কের নাম স্বামী-স্ত্রী দিয়েছিলেন।

তিনি লিখেন, ‘যদি তোমাকে হারানোর ইচ্ছে থাকত, যদি এই ভালোবাসা ক্ষণিকের মোহ হতো তবে কখনোই এত পবিত্র এক বন্ধনের নামে তোমাকে নিজের বলে ঘোষণা করতাম না। কখনোই তোমাকে নিজের নামে লিখিত করতাম না। আমার কাছে এই সম্পর্ক কোনো সাময়িক অনুভূতি নয়, এটি আজীবনের অঙ্গীকার, বিশ্বস্ততা আর একে অপরকে পাশে থাকার নীরব শপথ ছিল। কিন্তু তুমি সব শেষ করে দিলা। আচ্ছা যদি যাওয়ারই ছিল আসছিলাই কেন.?’

পোস্টে সাইদুল আরও লিখেন, ‘বহুকাল বয়ে বেড়াতে হবে হৃদয় ভাঙা এই ব্যথা, হয়তো এই জন্মে আর সেরে উঠবে না মৃত্যু ছাড়া। তাই আমি সেই পথেই গেলাম। সারা জীবন মানুষরে বুঝাইলাম অথচ দিন শেষ এসে দেখি আমি নিজেই অবুঝ..! যাও ভলো থালো যতটুকু দূরত্ব নিয়ে তুমি চলে গেলে তার থেকে দ্বিগুণ দূরত্ব নিয়ে আমি হারিয়ে গেলাম। সুখে থাকো এটাই কামনা। তোমাকে বলেছিলাম না এটাই আমার শেষ শক্তি হয়তো তুমি, নয়তো আমি শেষ। নাও তারও প্রমাণ দিলাম সারাজীবন তো প্রমাণই দিয়ে আসলাম তারপরও। যাই হোক। তুমি তো জানোই চাইলে আমি অনেক কিছুই করতে পারতাম। কিন্তু আমার প্রতিপক্ষ তো তুমি হয়ে গেলা, কী আর করবো, যাও প্রমাণ সব তোমার অনুকূলে কারণ। আমার পক্ষের উকিল হচ্ছে এমন নীরবতা আমার নীরবে হারিয়ে যাওয়া, যেখানে তুমি জবানবন্দি দিলে আর তুমি দিলে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায়।’

শেষে পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে সাইদুল লিখেন, ‘আম্মু আর পারতেসি না আর তিলে তিলে মরার শক্তি আমার নাই। মাফ করবেন আপনাদের অযোগ্য ছেলেকে। আমার যেন আর কিছুই করার নাই। একদম ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেলাম।’

ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।

Link copied!