পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে এডিবি

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে এডিবি

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশকে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সহজ শর্তের এ ঋণের অর্থে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের দুর্গম ২৬টি উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হবে।

আজ (মঙ্গলবার) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে এডিবি।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলের আরও অন্তত ৮৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎ–সুবিধার আওতায় আসবে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ৩৫ হাজার পরিবার রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‘সাসটেইনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট ইন দ্য চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস’ প্রকল্পের আওতায় ছয়টি ৩৩/১১ কিলোভোল্ট উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা ৮০ মেগাভোল্ট অ্যাম্পিয়ার বাড়বে। পাশাপাশি কম বিদ্যুৎ ক্ষয় হয় এমন পরিবাহক ব্যবহার করে ৫ হাজার ৩২ কিলোমিটার নতুন বিতরণলাইন স্থাপন করা হবে।

এ ছাড়া পুরোনো ও জরাজীর্ণ ১ হাজার ৮৭৪ কিলোমিটার বিতরণলাইন সংস্কার করা হবে। চারটি উপকেন্দ্র, একটি সুইচিং স্টেশন এবং একটি জোনাল মেরামতকেন্দ্রও আধুনিকায়নের আওতায় আনা হবে।

এডিবির হিসাবে, এসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে সিস্টেম লস ও পরিচালন ব্যয় কমবে এবং দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে। প্রকল্পের আওতায় বছরে অন্তত ১৯ হাজার ৩০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশে বিদ্যুতায়নের হার ৯৯ শতাংশে পৌঁছালেও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে গ্রিড বিদ্যুতের প্রবেশাধিকার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়িতে গ্রিড বিদ্যুতের আওতায় রয়েছেন ৪৯ শতাংশ মানুষ। রাঙামাটিতে এ হার ৪৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৪১ শতাংশ।

এডিবি আশা করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলে গ্রিড বিদ্যুতের প্রবেশাধিকার ৬৮ শতাংশে উন্নীত হবে। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ও ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রিডে যুক্ত করার উপযোগী করেও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।

এডিবির বাংলাদেশে কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝাং বলেন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকল্পটি দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ বাড়াবে এবং নারীর অংশগ্রহণও বাড়াবে।

বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কের উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সেবার পরিধি বাড়াতেও প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে অন্তত ৩০টি সৌরবিদ্যুৎচালিত নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংগঠনগুলো এসব ব্যবস্থা পরিচালনা করবে। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী রাখার শর্ত থাকবে।

বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের সময় জরুরি সেবা অব্যাহত রাখতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সেবা গ্রহণকারী অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ব্যাকআপ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্কুল, হাসপাতাল, মন্দির ও ক্লিনিক রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় অন্তত ১ হাজার মানুষকে জীবিকাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের জন্য ২০০-এর বেশি উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া ৩০০ শিক্ষার্থীকে জ্বালানি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দুর্যোগসহনশীল বিদ্যুৎব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

গ্রাহকসেবা আরও উন্নত করতে তিনটি অভিযোগকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থাসহ তিনটি শিশুযত্নকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রাহকসেবা, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং দুর্যোগসহনশীল প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এডিবির ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঋণের পাশাপাশি প্রকল্পে জাপান সরকারের অর্থায়নে এডিবি পরিচালিত জাপান ফান্ড ফর প্রস্পেরাস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক থেকে ২ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়া হবে।

প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার ৩৬ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ৪৫ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে। প্রকল্পটির নির্বাহী ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বিপিডিবি।

এডিবির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। তাঁদের অর্ধেকের বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

নতুন এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

Link copied!