বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না: হাইকোর্ট

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না: হাইকোর্ট

ফাইল ছবি

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের মতো গুরুতর শাস্তি দিতে হলে তা শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’ কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনুমোদিত হতে হবে। বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কোনো গভর্নিং বডি শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট

অসদাচরণের অভিযোগে এক কলেজ শিক্ষকের বরখাস্তের সিদ্ধান্তে বোর্ডের অনাপত্তি চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারিকৃত রুল খারিজ করে এ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রায়ে আদালত বলেছেন, বেসরকারি কলেজের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষেত্রে প্রবিধানমালা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো শিক্ষককে কারণ দর্শানোর যথোপযুক্ত সুযোগ না দিয়ে বা কেবল মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে তড়িঘড়ি করে বরখাস্ত করা সম্পূর্ণ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি।

মোহা. আখতারুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য মামলায় এ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

গত ৭ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী এবং বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সোমবার (৩১ আগস্ট) রায়টি প্রকাশ করা হয়। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবির।

রায় ঘোষণার সময় রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মো. কামরুজ্জামান। কলেজ শিক্ষকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতান মাহমুদ বান্না।

রায়ে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নামঞ্জুর করে তাকে বকেয়া বেতন-ভাতা এবং অবসরোত্তর সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন আদালত।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে অনৈতিক বা অসদাচরণের অভিযোগ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, শিক্ষক আবুল মনসুর ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় জাকিয়া বেগমের বাড়িতে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, আবুল মনসুর প্রথমে জাকিয়া বেগমের মেয়েকে একটি বই ফেরত দেওয়ার কথা বলে সেখানে যান। পরে অসৎ উদ্দেশ্যে আবার ফিরে এসে তার ছোট মেয়ের পাশে বসেন এবং তার মাথায় ও হাতে স্পর্শ করেন। তিনি তৃতীয়বারও বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কলেজের অধ্যক্ষ ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর শিক্ষক আবুল মনসুরকে শোকজ নোটিশ দেন। তবে আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই প্রথম নোটিশে অভিযোগের তারিখ হিসেবে ৭ নভেম্বর উল্লেখ করা হয় এবং শিক্ষককে তিন দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। শিক্ষক পরদিন জবাব দিয়ে বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। শিক্ষকের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গভর্নিং বডি ২৯ নভেম্বর পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্নসংবলিত দ্বিতীয় শোকজ নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবে শিক্ষক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আবার অস্বীকার করেন।

এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই তদন্ত কমিটি নিয়মবহির্ভূতভাবে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর দেখানো হয়।

পরবর্তীতে অনুমোদনের জন্য গভর্নিং বডির নেওয়া সিদ্ধান্তটি ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র কাছে পাঠানো হয়।

২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় কমিটি গভর্নিং বডির বরখাস্তের প্রস্তাব নামঞ্জুর করে। একই সঙ্গে শিক্ষককে সব বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।

২৮ মে একটি মেমোর মাধ্যমে কমিটির সিদ্ধান্ত কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা হলেও শিক্ষা বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত বিধান নেই।

এরপর শিক্ষা বোর্ডের ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করেন এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।

চূড়ান্ত শুনানি শেষে চলতি বছরের ৭ জুলাই হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশও বাতিল করা হয়।

আদালত রায়ে স্পষ্ট করেন, আপিল ও সালিশ কমিটি’র পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত বা অপসারণ কার্যকর করা যায় না। গচিহাটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার আগেই নিজেদের সিদ্ধান্তে বরখাস্ত কার্যকর করে বোর্ডের আইনি এখতিয়ারকে অগ্রাহ্য করেছে বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অবসর গ্রহণের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাকে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে আদালত বলেন, যেহেতু বিচারাধীন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক মো. আবুল মনসুর ইতোমধ্যে অবসরগ্রহণের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছেছেন, তাই তাকে বর্তমানে সরাসরি পূর্বের পদে পুনর্বহাল করার সুযোগ নেই। তবে তিনি বরখাস্তের তারিখ থেকে শুরু করে অবসরে যাওয়ার তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্য তার সমস্ত বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিজনিত সুযোগ-সুবিধা এবং পেনশনের যাবতীয় পাওনা পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী হবেন। রায়ে শিক্ষাবোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফলে শিক্ষক মো. আবুল মনসুর বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসর গ্রহণের তারিখ পর্যন্ত বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিসংক্রান্ত সব সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন। এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

Link copied!