যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালো শ্রীলঙ্কা

তিথি চক্রবর্তী

জানুয়ারি ২৪, ২০২৪, ০৬:০৭ পিএম

যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালো শ্রীলঙ্কা

সংগৃহীত ছবি

দুর্নীতি ও অপশাসনের কবলে পড়ে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো ২০২২ সালে দেউলিয়া হয়ে যায় ভারত মহাসাগরের দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা। জনবিক্ষোভের মুখে রাজাপক্ষে ভ্রাতৃদ্বয় দেশ ছেড়ে পালানোর পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশটি। তেঁতে ওঠা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে ঘুরে দাঁড়ানোর বিস্ময়কর সফলতা দেখিয়েছে দেশটি। শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই নয়, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কাটিয়ে রিজার্ভ বাড়ানোও শুরু করেছে দেশটি। পাশাপাশি শোধ করছে বৈদেশিক ঋণ।

পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে শ্রীলঙ্কার নতুন সরকার দক্ষতার সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট কাটিয়ে অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে সক্ষম হয়। তারা মাত্র ১৫ মাসে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে ক্রমেই উন্নতির পথে হাঁটতে শুরু করে। জর্জরিত শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়িয়ে এখন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এ যেন বিরাট এক ‘যুদ্ধ’ জয়।

প্রশ্ন থেকে যায়– কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করল দেশটি! মূলত বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সুদহার বাড়ানো ও ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ— এই তিন প্রধান পদক্ষেপের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা এই অসাধ্য সাধন করেছে। এই প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ বড় ভূমিকা পালন করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের প্রভাব ছাড়াই যাতে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে সে উদ্যোগও নিয়েছে। দেশটির মনিটরি বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি থাকতো। ফলে মুদ্রানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব রাখার সুযোগ ছিল। কিন্তু আইন পরিবর্তন করে বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা এবং অন্যরা কী করছে সবকিছু বিবেচনা করে শ্রীলঙ্কার জন্য কোনো ধরনের নীতি গ্রহণ করাটা সবচেয়ে ভালো হবে গভর্নর সেটিই করেছেন।

বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে তারা আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে, যেটি মূল্যস্ফীতি কমাতেও ভূমিকা রেখেছে। এটিও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া কিছু খাতে সংস্কারের পাশাপাশি আইএমএফের সঙ্গে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি ‘বেইল আউট প্যাকেজ’ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন রনিল বিক্রমাসিংহে। পরে সেটি অনুমোদনও পায়। এরপর সামান্য হলেও খাদ্যমূল্য ও বিদ্যুতের দাম কমিয়ে জনজীবন সহজ করার চেষ্টা করে শ্রীলঙ্কা সরকার। সেই সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শুরু থেকেই ব্যয় কমানোর চেষ্টা করে ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। জোর দেয়া হয় বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর। এ ছাড়া ব্যয় সাশ্রয়ে চলতি বছরেও সব মন্ত্রণালয়ের বাজেট ৬ শতাংশ করে কমিয়েছে রনিল বিক্রমাসিংহের সরকার। দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা কমিয়ে অর্ধেকে আনার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রীলঙ্কা সরকার সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে অনেক খাতে কর বাড়ানো এবং অনেক খাতে ভর্তুকি কমানোর মতো অ-জনপ্রিয় পদক্ষেপও নিয়েছে, যা জাতীয়তাবাদী চেতনায় বলীয়ান হওয়া জনগণ মেনে নিয়েছে। কিন্তু সবার আগে শ্রীলঙ্কার সরকারকে দেখাতে হয়েছে যে, তার সত্যিকারের সদিচ্ছা আছে মন্দা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের। আর এ বিষয়টিই রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্য বড় এক শিক্ষা হতে পারে।

Link copied!