জুলাই ৯, ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের দিকে হামলা চালানোর দাবি করেছে তেহরান। এতে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে এবং যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা শেষ করে দিয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও বন্দর এলাকায় বিমান হামলা চালায়।
বৃহস্পতিবারের হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর থাকা বাহরাইনে অন্তত দুই দফা সাইরেন বাজে। কুয়েত জানায়, দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহরাইন ও কুয়েতে হামলার দাবি করলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। প্রকাশিত ভিডিওতে বিমানঘাঁটির রানওয়ে ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় আঘাত হানার দৃশ্য দেখা যায়। সেন্টকমের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তার প্রতি ইরানের হুমকি কমাতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বুশেহর, চাবাহার, কোনারাক, বন্দর আব্বাস ও সিরিকসহ একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশে অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরানশাহরে একটি বিমানবন্দরে হামলায় একজন অগ্নিনির্বাপণকর্মী নিহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে আবারও হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানে বিস্ফোরণের ভিডিও প্রকাশ করে তিনি লেখেন, আগের দিনের জাহাজে হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে এবং একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প বলেন, বর্তমান সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে রূপ নেবে বলে তিনি মনে করেন না। যদিও প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ‘কাজ শেষ করে দেবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খার্গ দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করার পুরোনো হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালির চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের রয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বুঝতে পারেনি যে চাপ সৃষ্টি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মূল্য দিতে হয়। তিনি বলেন, ‘আপনি আঘাত করলে পাল্টা আঘাত পাবেন।’
ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা কার্যত শেষ হয়ে গেছে, যদিও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে আলোচনার সফলতা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে বলেন, এটি শক্তির প্রকাশ নয়; বরং ইরান নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলা পারস্য উপসাগর অঞ্চলে পূর্ণমাত্রার সংঘাত আবারও শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়।
একই সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর স্থায়ী শান্তি চুক্তি নিয়ে নতুন দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলছিল। আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণাঙ্গ নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা এবং ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
তথ্যসূত্র: এপি