সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি হওয়া স্থাবর সম্পত্তির ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নিলাম ক্রেতাদের কাছ থেকে ওই ভ্যাট আদায়ের নির্দেশেরও কোনো আইনি কার্যকারিতা নেই বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারপতি সরদার রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল ও সম্পূরক রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন। গত ১ সেপ্টেম্বর রায় দেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন নিলাম ক্রেতাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব।
মামলার নথি অনুযায়ী, একটি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে নেওয়া কার্যকরী মূলধন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংকটি ঢাকার অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। পরে অর্থঋণ জারি মামলার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(১) ধারায় বন্ধকি সম্পত্তিটি নিলামে তোলা হয়।
নিলামে আবেদনকারীরা সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ২৪ কোটি টাকায় সম্পত্তিটি কিনে নেন। তাদের দর অনুমোদনের পর নির্ধারিত পুরো অর্থও আদালতে জমা দেন তারা। পরে অর্থঋণ আদালত জমাকৃত অর্থ ও পাউন্ডেজ ফি গ্রহণ করে নিলামমূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং প্রযোজ্য স্ট্যাম্প ডিউটি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে নিলাম ক্রেতা ও ডিক্রিধারী ব্যাংক উভয়েই আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে আগের কয়েকটি রায়ের আলোকে ডিক্রিধারী ব্যাংককে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও নিলাম ক্রেতাদের আবেদন নাকচ করে তাদের ওপর ভ্যাট ও স্ট্যাম্প ডিউটি পরিশোধের নির্দেশ বহাল রাখা হয়।
এরপর ওই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন নিলাম ক্রেতারা। গত ৮ এপ্রিল বিচারপতি আকরাম হোসেন চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। একই সঙ্গে রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতের ওই নির্দেশের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়।
রুলের শুনানিতে নিলাম ক্রেতাদের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান। তাদের সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব ও অ্যাডভোকেট সাজিদ হাসান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান।
দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট রুল ও সম্পূরক রুল চূড়ান্ত ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়, নিলাম ক্রেতাদের কাছ থেকে নিলামমূল্যের ওপর উৎসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ের নির্দেশ দিয়ে অর্থঋণ আদালত যে আদেশ দিয়েছিল, তা আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং এর কোনো আইনগত কার্যকারিতা নেই।
এ ছাড়া বিতর্কিত এসআরওর যে অংশে স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতাকে ‘পণ্যের নিলাম ক্রেতা’র সংজ্ঞার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেই অংশও আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত বলে ঘোষণা করেছেন আদালত।
আইনজীবীরা বলছেন, এ রায়ের ফলে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে বিচারিক নিলামে কেনা স্থাবর সম্পত্তির মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। একই সঙ্গে সংসদ কোনো সম্পত্তির বিক্রয় বা হস্তান্তরকে আইনের মাধ্যমে ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দিলে অধস্তন বা অর্পিত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সেই সম্পত্তির ওপর নতুন করে ভ্যাটের দায় চাপানো যাবে না—রায়ের মাধ্যমে এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অর্থঋণ আদালতে ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য পরিচালিত বিচারিক নিলাম এবং এসব নিলামে স্থাবর সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে রায়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।