ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনোনয়ন পেয়েছেন। বড় কোনো রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক ব্যত্যয় না ঘটলে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী হিসেবে তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী এবং ২৩ তম রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর এই যাত্রা অবশ্য ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে শুরু হয়নি। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে ধীরে ধীরে রাজনীতির মাঠে আসেন মির্জা ফখরুল। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও রাজনীতিতে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা ছিল।
১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি একটি দপ্তরে নিরীক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর সম্পৃক্ততা বাড়ে। পরে আবার শিক্ষকতায় ফিরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম কয়েকবার পরাজিত হলেও ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। একই বছর গঠিত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পরও বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী হতে থাকে। ২০০৯ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। ২০১১ সালে খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবিতে আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন বিএনপির অন্যতম প্রধান নেতা।
বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ সময়ে তাঁকে বহুবার গ্রেফতার হতে হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা থাকার কথা বিএনপি ও তাঁর আইনজীবীরা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় একাধিকবার কারাবন্দি হন তিনি। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের আগে তাঁকে তাঁর বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির ঢাকার মহাসমাবেশকে ঘিরে সংঘর্ষ ও সহিংসতার পরদিন ভোরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন।
রাজপথের আন্দোলনে শুধু গ্রেফতার নয়, সভা-সমাবেশে হামলা, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে আছে। বয়স ও নানা শারীরিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দীর্ঘ সময় দলীয় আন্দোলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন তিনি।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও দলীয় সিদ্ধান্তে তিনি সংসদে শপথ না নেওয়ায় আসনটি পরে শূন্য ঘোষণা করা হয় এবং সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত, আর ছোট মেয়ে সাফারুহ শিক্ষকতা করছেন।
শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পৌর রাজনীতি, সংসদ ও মন্ত্রিসভা পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দেওয়ার পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে বিরোধী আন্দোলন, মামলা, গ্রেফতার ও দলীয় সংকট মোকাবিলার মধ্য দিয়ে। সেই দীর্ঘ পথচলার পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর প্রার্থিতা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।