মার্চ ১৮, ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে এক সময়ের পরিচিত মুখ অভিনেতা শামস সুমনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে বিনোদন অঙ্গনে। তার প্রয়াণের পর সহশিল্পী শাহরিয়ার নাজিম জয়ের একটি আবেগঘন ফেসবুক পোস্টে উঠে এসেছে অভিনেতার জীবনের শেষ সময়ের সংগ্রাম, অর্থকষ্ট ও নিঃসঙ্গতার কথা।
গত ১৭ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান নব্বই দশকের এই জনপ্রিয় অভিনেতা। মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহকর্মী, বন্ধু ও ভক্তদের শোকবার্তায় ভরে যায়।
শামস সুমনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী শাহরিয়ার নাজিম জয় একটি পোস্টে প্রয়াত অভিনেতাকে স্মরণ করেছেন। সেখানে তিনি জানান, মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। একসঙ্গে ইফতার করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

জয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ সময়ে নানা ব্যক্তিগত টানাপোড়েন ও আর্থিক চাপের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন শামস সুমন। বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের এই অভিনেতা অনেক কিছু নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।
ফেসবুক পোস্টে জয় তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও একসঙ্গে কাজ করার স্মৃতিও তুলে ধরেন। মঞ্চনাটকের সময় থেকেই শামস সুমনের অভিনয় তাকে মুগ্ধ করেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরবর্তীতে টেলিভিশন নাটকে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
জয়ের লেখায় আরও উঠে এসেছে, জীবনের শেষ দিকে হতাশা ও চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন সুমন। তিনি লিখেন, ‘তোমার জীবন থেকে যা শিখলাম, পৃথিবীতে তুমি যত কাজ করো না কেন, যত সম্মান অর্জন করো না কেন, তোমার যা টাকা লাগবে তা যদি তোমার কাছে না থাকে, তাহলে তুমি সত্যিই মানসিক চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে। আমি জানি তোমার বেলায় তাই হয়েছে। বাচ্চাদের জন্য তোমার অনেক চিন্তা ছিল। তাদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তুমি তা জোগাড় করতে পারছিলে না। তোমার ফ্যামিলির লন্ডনে থাকে, তারা চেয়েছিল তুমি লন্ডন চলে যাও। কিন্তু তুমি দেশ ছেড়ে যাবে না। এই নিয়ে ছিলে এক বিশাল দ্বন্দ্ব। সবাই চলে গেল। তুমি একা রয়ে গেলে রেডিও ভূমিতে এবং মাতৃভূমিতে। তোমার বয়সে পুরুষ একা থাকতে পারে না। থাকবেই বা কেন? একা থাকার জন্য তো সে জীবনের শুরুতে সংসার শুরু করেনি। একা থাকার জন্য সে সমস্ত রোজগার সংসারের জন্য ব্যয় করেনি। সবাই সবার ভবিষ্যতের জন্য, উন্নত জীবনের জন্য যার যার গন্তব্যে চলে গেছে। আর তুমি তাদের সবকিছু দিয়ে একা একা স্যাকরিফাইস করেছ। খাবার অসুবিধা, লোকের অসুবিধা, টাকার অসুবিধা! এত অসুবিধা নিয়ে ৬০ বছর বয়সে বাঁচা কি সম্ভব? না সুমন ভাই। সম্ভব না। কারো কোনো দোষ নেই, ভাবিরও নেই, বাচ্চাদেরও নেই, তোমারও নেই। দোষ তোমার ভাগ্যের। দোষ তোমার দেশপ্রেমের।’
অনেক শিল্পী দেশ ছেড়েছে। দেশ ছেড়েছিল সুমনের পরিবারও। সুমন কেন দেশেত্যাগ করতে পারেননি? জয় লিখেছেন, ‘লন্ডন চলে গেলে তুমি তো অনেক উন্নত জীবন পেতে। কিন্তু যাওনি, এখানে এই মাটিতে এই বাতাসে তুমি থাকতে চেয়েছো। এখানেই থাকলে, এখানেই মরলে। মাতৃভূমি, রেডিও ভূমি এরপর মাটির ভূমি। সেখানেই তুমি ঘুমাও ভাই। তোমার আর কোনো দায়িত্ব নাই। আর আসতে হবে না চ্যানেল আইয়ে। আর ফিরতে হবে না ঘরে। আর কোনো টেনশন করতে হবে না। টাকার কথা ভাবতে হবে না। তোমার জীবন থেকে আমি শিখলাম, জীবন ছোট। এক মুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না। এক মুহূর্ত নিজেকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। জীবনের প্রয়োজনের যে টাকা, সেই টাকার জোগাড় অবশ্যই করে রাখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নাই। তোমার মতো সকলের প্রিয় আমি হতে পারব না। সেই সমর্থ্য আমার নাই। কিন্তু তোমার মতো নিজেকে কষ্ট আমি দেবো না। বুঝে গেছি ভাই। তুমি বুঝিয়ে গেছো, নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক না।
তার মতে, জীবিত অবস্থায় হয়তো অনেকেই অভিনেতার মূল্যায়ন করতে পারেননি, কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষের প্রতিক্রিয়ায় তার জনপ্রিয়তার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শামস সুমনের মৃত্যুতে অভিনয়জগতের অনেকেই গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তার অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করছেন।