তালেবান উত্থানে শংকার মেঘ বাংলাদেশেও

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

আগস্ট ১৬, ২০২১, ০৫:০৮ পিএম

তালেবান উত্থানে শংকার মেঘ বাংলাদেশেও

আফগানিস্তানে ২০ বছর পর আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে উগ্র তালেবান গোষ্ঠী। দেশটির পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তাপ এরমধ্যেই টের পাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো। তালেবানের উত্থানে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠার আশংকা রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন এজেন্সিকে সজাগ থাকার পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান ছিল তালেবানদের দখলে। ওই সময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন শক্তি হিসেবে ক্ষমতায় থেকেছে তারা। তবে এবার তাদের আর আগের মত উগ্র চেহারার আভাস মিলছে না। আন্তর্জাতিক প্রভাব বলয়ের প্রচ্ছন্ন সমর্থন নিয়েই তারা ফের ক্ষমতার মঞ্চে। তারপরও তাদের আশ্চর্যজনক সফলতায় বাংলাদেশে থাকা উগ্রবাদীরা আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে। এ দেশে তাদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান এ বিষয়ে দ্য  রিপোর্টকে বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে জঙ্গিদের সম্ভাবনা সব সময় আছে। তালেবান একটি অসংগঠিত দল হলেও এবার তারা সুসংগঠিত হয়ে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিকে হঠিয়ে ক্ষমতা দখলে নিয়েছে। তালেবান প্রথমবার ক্ষমতায় যাওয়ার সময় কোনো আন্তর্জাতিক সমর্থন ছিল না।  তবে এবার বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ এবং চীন ও রাশিয়া তাদের সাথে কাজ করবে বলে এরমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে। যুক্তরাজ্য তো আগেই ঘোষণা দিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে তারা তালেবানের সাথে কাজ করবে। তবে শঙ্কাও রয়েছে। তালেবান যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যান্য দেশের জঙ্গিরাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশেও এই সম্ভাবনা রয়েছে।’

গত ১৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সাইনবোর্ডে পুলিশ হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চলতি বছর ১৬ মে শফিকুর রহমান হৃদয় ওরফে বাইতুল্লাহ মেহসুদ ওরফে ক্যাপ্টেন খাত্তাব ও মো. খালিদ হাসান ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। সিটিটিসি বলছে, তারা দুজনেই নব্য জেএমবির সদস্য। তারা অনলাইনে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতেন।

এ বিষয়টি উল্লেখ করে ওয়ালিউর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে আম পাঠিয়েছেন। ইমরান খানও আম পাঠিয়েছেন। তবে এই ‘আম ডিপ্লোমেসি’ বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের নিদর্শন নয়। তারা সব সময় বাংলাদেশে অস্থিতিশীল দেখতে চায়। এটা ভুলে গেলে চলবে না।’

বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানে জঙ্গিবাদের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে উল্লেখ করে বাংলাদেশের এই সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি), জইশ-ই মোহাম্মদসহ বেশ কয়েকটি জঙ্গিদলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে। আফগান তালেবানের সাফল্যে দেশটিতে উগ্রপন্থী ওইসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাকিস্তানে অস্থিতিশীল করার  চেষ্টার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।’

তবে আফগানিস্তানে তালেবানদের ফের উত্থানে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বে জঙ্গিবাদের প্রভাব বাড়তে পারে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব-এশিয়া অধ্যয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. দেলোয়ার হোসেন।

শনিবার (১৪ আগস্ট) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, জাতীয় শোক দিবসকে ঘিরে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন তৎপর রয়েছে। ১৫ আগস্ট ঘিরে জঙ্গি হামলার শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।’

ডিএমপি কমিশনারের এই বক্তব্য তুলে ধরে অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, জঙ্গিবাদের আশঙ্কা আগেও ছিল, এখনও আছে। আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা কতদিন স্থায়ী হবে, তাদের শাসন ব্যবস্থা বা ক্ষমতা সুসংহত হচ্ছে কিনা-এসবের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বে জঙ্গি তৎপরতা ছড়ানোর বিষয়টি জড়িত। তাদেরকে ক্ষমতায় আনার পেছনে যারা সহযোগিতা করেছে তারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তালেবানের চরিত্র ও মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশেও জঙ্গির সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, বাংলাদেশের বেশ কিছু লোক এরই মধ্যে তালেবানের সাথে যোগ দিতে আফগানিস্তান গেছেন। তারা ফিরে আসলে জঙ্গি তৎপরতা যে বেড়ে যাবে, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখেন না।’

তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গি মোকবিলায় নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করে কূটনৈতিক ওয়ালিউর রহমান বলেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ (র‌্যাব) বিভিন্ন এজেন্সি যেভাবে জঙ্গি মোকাবিলায় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত রাখতে হবে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বাড়াতে হবে আরও গোয়েন্দা তৎপরতা। তাদের চারদিকের চোখ আরও সতর্ক ও খোলা রাখতে হবে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনও একই মত পোষণ করেন। জঙ্গিদের ব্যাপারে জনগণকে সচেতন থাকার পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনগণকেও সতর্ক থাকতে হবে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করতে সামাজিক আন্দোলন চালানোরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

Link copied!