নভেম্বর ১৯, ২০২৩, ০৩:১৭ পিএম
ফাইল ছবি
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘একতরফা’ তফসিলের প্রতিবাদে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিনে রাজধানীতে বিএনপি বিভিন্ন স্থানে ‘ঝটিকা’ মিছিল এবং সমমনা জোটগুলো পুরানা পল্টনের বিজয়নগর সড়কে ‘বিক্ষোভ মিছিল’ করেছে।
রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর পুরানা পল্টন, বিজয় নগর, তোপখানা রোড, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনে, তেজগাঁও রেল স্টেশন সড়ক, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল সড়ক, বাড্ডা, ফকিরাপুল, গ্রীন রোড প্রভৃতি সড়কে এসব কর্মসূচি পালন করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
বিএনপি
তেজগাঁও রেল স্টেশনের সড়ক, ফকিরাপুল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ সড়ক, ঝিগাতলা, বনানীর কাকলীর সামনের সড়ক, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল সড়ক, গুলশানে ছাত্র দল ও বাড্ডায় মহিলা দল, শাহবাগ, রমনা, মতিঝিল, গ্রিন রোডে স্বেচ্ছাসেবক দল সকালে ‘ঝটিকা’ মিছিল করে চলে যায়। এসব মিছিলে কোথাও ৩০/৩৫ জন আবার কোথাও কোথাও অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী ছিলেন।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গত ২৯ অক্টোবর থেকে বিএনপি টানা কর্মসূচি দিয়ে এলেও নেতা-কর্মীদের রাজপথে সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। ঝটিকা মিছিল করে ফেসবুকে পোস্ট করে সটকে পড়ছেন তারা।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় এক ডজনের অধিক নেতৃবৃন্দ কারাগারে আছেন, অন্যরা আত্মগোপনে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নিজেও আছেন আত্মগোপনে। অবরোধ কর্মসূচির তিনদিন ভোরে তাঁকে রাজধানীর তিনটি এলাকায় ঝটিকা মিছিলে দেখা গেছে। প্রতিদিনই তিনি বক্তব্য রাখছেন ভার্চুয়ালি।
এদিকে বিএনপির নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। গত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ পুলিশ পন্ড করে দেয়ার পর রাত থেকে এই কার্যালয়ে নেতা-কর্মী কাউকে দেখা যায়নি, কার্যালয়ের কলাসিবল গেইট তালাবদ্ধ দেখা যায়। কার্যালয়ের সামনে দুই পাশে বসানো হয় পুলিশি নিরাপত্তা যা এখনো বলবৎ আছে।
বিএনপির এই আন্দোলনের মধ্যে গত বুধবার তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। গত ৩১ অক্টোবর থেকে সরকারি ছুটির দিন ও দুটি মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন অবরোধ পালন করে আসা বিএনপি এর প্রতিক্রিয়ায় রবি ও সোমবার হরতালের ডাক দেয়।
গণতন্ত্র মঞ্চ
বেলা সাড়ে ১২টায় বিজয় নগর সড়কে একতরফা তফসিলের প্রতিবাদে মিছিল করে তারা। মিছিলটি সরকার বিরোধী নানা শ্লোগান দিয়ে বিজয়নগর সড়ক প্রদক্ষিন করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়কারী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘‘ ২০২৩-২৪ এ বাংলাদেশে যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা, এটা বাংলাদেশের মানুষের রক্ষার লড়াই। গণতন্ত্র আর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে স্বাধীনতাও থাকবে না, মানুষের কোনো অধিকার থাকবে না। কাজেই এই লড়াইয়ে পরাজয়ের কোনো জায়গা নেই। এই লড়াইয়ে আমাদের বিজয়ী হতেই হবে।”
‘‘জনগণ এবং আমাদের বিরোধী দলের নেতৃত্ব বিজয়ী না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাব… রাজপথে জনগণের দখল তৈরি হবে এবং সেই লড়াই আগামী দিনের আপনারা গড়ে তুলবেন। গণতন্ত্র মঞ্চ, বিএনপি, ৩৬টা রাজনৈতিক দল তারা যুগপৎ ধারা এই লড়াইকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাবে। আজকে অপরাপর রাজনৈতিক দল এই ৩৬ দলের বাইরেও সবাই যার যার অবস্থান থেকে নেমেছে।”
তিনি বলেন, ‘‘উনাদের (আওয়ামী লীগ) মিত্র জাতীয় পার্টিও এখন উনাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব এটাও বলে না। অতএব আওয়ামী লীগ আর কিছু লোক পয়সা দিয়ে ভয় দেখিয়ে কিছু লোককে জড়ো করে তারা বলছেন, এটা নাকি নির্বাচন।”
‘‘লজ্জ্বা, লজ্জ্বা, লজ্জ্বা। কি রকম নির্লজ্জ্ব আওয়ামী লীগ.. এখন নিলর্জ্জ্বের মতো ভোট ডাকাতিকে নির্বাচন বলে। আমরা জনগণ বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে এভাবে ধ্বংস করতে দেব না আর সেই কারণে এই লড়াই যখন চলবে, এই লড়াইকে বিজয়ী করে আমরা ঘরে ফিরবো।”
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
সমাবেশে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘‘একতরফা নির্বাচনের তফসিল কি মানুষ গ্রহণ করেছে? সকল মানুষ এটা প্রত্যাখান করেছে, বর্জন করেছে। তারপরেও সরকারি দলের নেতারা এবং সরকারের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রতিদিন তাদের যে মিথ্যাচার, শঠতার প্রতারণা এবং তাদের যে জালিয়াতির বক্তব্য শয়তানও পর্যন্ত লজ্জ্বা পাচ্ছে এবং এদের অধীনে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তারা করতে পারবে… এই কথা শুনে গাধাও নাকি হাসে। আর প্রতিদিন সরকার বলছে তারা নাকি অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবে। আপনি বিরোধী দলের ওপরে দমন-নিপীড়ন চালিয়ে সেখানে আপনি ভোটের উৎসবের আয়োজন করেছেন।”
‘‘প্রধানমন্ত্রী দুইদিন আগে তিনি বিএনপিসহ বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারকে পরিস্কার করে বলতে চাই, আমরা রাজনৈতিক সংকট রাজনৈতিকভাবে নিশ্চয়ই সমাধান করতে চাই, আলাপ-আলোচনা করে নিশ্চয়ই আমরা একটা রাজনৈতিক সংকটের সমাধান দেখতে চাই। প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার যদি এ কথা অন্তর থেকে বলে থাকেন পরিষ্কার করে আমরা গণমাধ্যমের সামনে আজকে বলতে চাই, অনতিবিলম্বে এই নির্বাচন, নির্বাচনী তফসিল স্থগিত ঘোষণা করুন, সকল বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের যাদেরকে আপনি জেলখানায় বন্দি করে রেখেছেন অনতিবিলম্বে তাদেরকে নিঃশর্ত মুক্তির দেবার ব্যবস্থা করুন এবং যে হাজার হাজার মামলা বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপরে দায়ের করেছেন, হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছেন সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করুন। যদি একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়… বিরোধী যেভাবে বলেছে, সরকার নির্বাচনের আগে কিভাবে পদত্যাগ করবে, কিভাবে নির্বাচনকালীন অন্তর্বতী সরকার হবে এব্যাপারে সরকারি দল নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন নিশ্চয় আমরা মনে করি বিরোধী দলের যেরকম সংলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে।”
‘তার আগে আপনারা (সরকার) যে নির্বাচনের নামে রঙ-তামাশা শুরু করেছেন, নির্বাচনের নামে আরেকটা একতরফা আরেকটা জালিয়াতি মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে যেভাবে নয়-ছয় শুরু করেছেন বাংলাদেশের মানুষ কোনোভাবে এটাকে বরদাসত্ব করবে না’ বলেও হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ রাজপথে লড়াই চলছে। আগামীকাল ৪৮ ঘণ্টা হরতালের পরে আমরা আন্দোলনে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করব।”
‘‘ কিন্তু পরিস্কার করে বলতে চাই, এটা ’১৪ বা ’১৮ সালের মতোন চিকন বুদ্ধি করে, রাতের অন্ধকারে অথবা দিনের ভোট রাতে করে অথবা জালিয়াতি করে কেবল মাত্র প্রশাসনকে ব্যবহার করে মানুষের ভোটের অধিকারের বিরুদ্ধে কোনোভাবে আপনাদেরকে মানুষ বরদাসত্ব করবে না।”
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট
বিজয়নগর সড়কের সকাল সাড়ে ১১টায় এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। এই মিছিলে এনপিপির ফরিদুজ্জমান ফরহাদ, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, জাগপার খন্দকার লুতফুর রহমান, সাম্যবাদী দলের সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এনডিপির আবু তাহের প্রমুখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে মিছিল শেষ করে।
গণঅধিকার পরিষদ
নুরুল হক নূরের নেতৃত্বে পরিষদের শতাধিক নেতা-কর্মীরা বিজয় নগর ও নয়া পল্টনের সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিলে ‘ভোট ডাকাতের তফসিল, মানি না, মানব না’, ‘শেখ হাসিনার গদিতে আগুন জ্বালাও এক সাথে’ ইত্যাদি শ্লোগান দেয়। নেতা-কর্মীদের হাতে ছিলো ‘ইন্তেকাল কমিশন’ লেখা প্ল্যাকার্ড।
গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য
তোপখানা রোড থেকে পুরানা পল্টনের মোড়ে ‘একতরফা’ নির্বাচনের প্রতিবাদে মিছিল করে তারা। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও, লড়াই করো’, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, ‘গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের হরতাল চলছে চলবে’ ইত্যাদি শ্লোগান দেয়। মিছিলে গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সমন্বয়ক বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (মার্কবাদী-লেলিনবাদী)সাধারণ সম্পাদক কমরেড হারুন চৌধুরী, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের অন্যান্যরা হলেন, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক কমরেড আবুল কালাম আজাদ, সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল হারুন আল রশিদ প্রমূখ নেতারা ছিলেন।
১২ দলীয় জোট
বেলা সাড়ে ১১টায় বিজয়নগর সড়কে তারা মিছিল করে। এই মিছিলে ছিলেন জাতীয় পার্টি(কাজী জাফর) নওয়াব আলী আব্বাস, জাগপার রাশেদ প্রধান, ইকবাল হোসেন, লেবার পার্টির ফারুক রহমান, কল্যাণ পার্টির নুরুল কবির ভুঁইয়া পিন্টু,বিএলডিপির এম এ বাশার, জাতীয় দলের শামসুল আহাদ,ইসলামী ঐক্যজোটের ইলিয়াস রেজা প্রমূখ নেতারা ছিলেন।
এলডিপি
বেলা ১২টায় নাইটেঙ্গল মোড়ে মিছিল করে তারা একতরফা নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবি জানায়। এই মিছিলে ছিলেন এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য নেয়ামুল বশির, যুগ্ম মহাসচিব বিল্লাহ মিয়াজীসহ নেতৃবৃন্দ।