কান্না থামেনি নিহত এসএসসি পরীক্ষার্থী তাজুনের পরিবারে

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

মে ১৬, ২০২৩, ০১:৫৩ এএম

কান্না থামেনি নিহত এসএসসি পরীক্ষার্থী তাজুনের পরিবারে

রাজধানীর শনির আখড়ায় ছুরিকাঘাতে নিহত এসএসসি পরীক্ষার্থী মুশফিক ইসলাম তাজুনের পরিবারে কান্না এখনও থামেনি। তাঁর মা-বোন এখনও বিলাপ করেন তাজুনের জন্য। তাঁর কাতার প্রবাসী বাবা মোশারফ হোসেন ফোন করে কাঁদেন পুত্র শোকে। একমাত্র ছেলেসন্তানকে হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে কাতার প্রবাসী মোশারফ। ছুটিতে নিয়মিত দেশে এলেও এবার তিনি তাজুনের এসএসসি পরীক্ষার পর সব গোছগাছ করে একবারেই দেশে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এরইমধ্যে তাঁর সবকিছু শেষ হয়ে গেল!

তাজুনের পরিবার জানায়, তাজুনের ভবিষ্যত ভেবেই বিদেশের মাটিতে কষ্টে কাটিয়ে দিচ্ছেন মোশারফ। কিন্তু গত ১০ই মে বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে শনির আখড়ার দনিয়া কলেজের সামনে একদল তরুণের হামলা থেকে বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হয় তাজুন।

সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে জানতে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে যান আমাদের দ্য রির্পোট ডট লাইভের এই প্রতিবেদক। তাজুনের বন্ধু শাওনের সাথে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, মুশফিক তাজুন আসকর আলী ও কোব্বাত মিঞা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (একে স্কুল এন্ড কলেজ) পড়ে। যাত্রাবাড়ী ও শনি আখড়া এলাকায় এই স্কুলের দুটি শাখা রয়েছে। তাজুন পড়তো একে স্কুলের নতুন ভবনে।

ঘটনার দিন বুধবার আইসিটি পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফিরে এরপর বিশ্রাম নিয়ে প্রতিদিনকার মত সে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে একই এলাকার দনিয়া কলেজের কাছে একটি চায়ের দোকানের দিকে যায়। আড্ডার সময় সেখানে গিয়ে প্রতিদিনের মত অর্নব, রায়হান, নাবিল, তাহসিন সাবু, শাওন সেখানে অপেক্ষা করছিল তাজুনের জন্য। তাজুন দোকানে যাওয়ার পর তারা সবাই পরীক্ষা নিয়ে কথা বলছিল। এই ছয় জনের মধ্যে নাবিল, শাওন, তাহসিন সাবু ও তাজুল একে স্কুলের ছাত্র। আর অর্নব আর রায়হান ছিল ব্রাইট স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র।

তাদের কথাবার্তার মধ্যে ব্রাইট স্কুলের আরেক ছাত্র হাসান এক পর্যায়ে রায়হানকে ডেকে নিয়ে যায় চায়ের দোকানের বাইরে। রায়হানের সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে রায়হানকে হাসান মারতে শুরু করে। সে সময় সেখানে হাসানের সাথে ওঁৎপেতে থাকা আরও ১০-১২ জন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।

এ সময় রায়হান প্রাণভয়ে দৌঁড়ে চায়ের দোকানে এসে অর্নব আর তাজুনকে বলতে থাকে, ‘বন্ধু, বাঁচা আমাকে।’

এ সময় অর্নব আর সাবু জানায়, তারা এসবে নাই। এই বলে দোকান থেকে তারা বের হয়ে সরে পড়ে। ওদিকে রায়হানকে হাসানের লোকজন মারতে থাকলে সে গিয়ে তাজুনের উপর পড়ে। তখন তাজুন তাদেরকে অনুরোধ করে মারামারি না করার জন্য।

এ সময় শান্ত নামের হাসানের সাথে আসা একজন তাজুনের গেঞ্জির কলার ধরে ফেলে। সাথে সাথে নাঈম, সাগর, আবির, শফিকসহ আরও আট-দশজন তাজুনকে মাটিতে ফেলে পেটাতে থাকে। এ সময় তাজুনের বন্ধু শাওন তাজুনকে ধরতে গেলে তাকেও মারধর করতে শুরু করে হামলাকারীরা। এই ফাঁকে তাজুন উঠে দৌঁড়ে পালাতে রাস্তার গলির দিকে গেলে দনিয়া কলেজের সামনে শফিক তাঁকে ছুরিকাঘাত করে। পেটে ছুরিকাঘাত নিয়েও তাজুন প্রাণে বাঁচতে প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে একটি ক্লিনিকে পৌছায়। কিন্তু সেখানে তাঁকে চিকিৎসা দেয়নি ক্লিনিকটি। না দিয়ে তারা তাজুনকে ঢাকা মেডিকেলে চলে যেতে বলে। এলাকার আরেক বন্ধু রাব্বি তখন তাজুনকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিসৎক তাকে মৃত ঘোষনা করেন।

তাজুন হত্যার ঘটনার পর ১৭ জন আসামীর মধ্যে এ পর্যন্ত মোট সাত জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে পুলিশ মো. শফিক (১৯), নাঈম (১৭), সাগর (১৭) ও আবিরের (১৭) নাম বললেও বাকি তিনজনের নাম জানাতে পারেনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনির হোসাইন।

দ্য রির্পোট ডট লাইভের পক্ষ থেকে এসআই মনিরকে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটের দিকে ফোন দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘তাজুন হত্যা মামলার তদন্ত কাজ চলছে।’ রায়হান, হাসান এবং অর্নব এই মামলার আসামী কিনা, বা আসামী হলে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে কিনা— এমন প্রশ্ন করলে প্রথমে এই প্রতিবেদকের ওপর তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। পরে তিনি ফোন কেটে দেন।

এর আগে মামলার এজাহার ভুক্ত তিন আসামি মাহমুদুল হাসান নাঈম (১৭), ইয়ানুর রহমান শান্ত (১৭) ও নাজমুস সাকিবকে (১৭) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত নাঈম ও শান্ত আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এই তিনজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল রাতে আরো চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ওই হত্যাকাণ্ডের পর তাজুনের দুলাভাই আশিকুর রহমান বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামী করা হয়।

Link copied!