ছবি: সংগৃহীত
জুলাই আন্দোলনের সময়ের আশরাফুল হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জামিন দিয়েছে আদালত।
আজ রোববার শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসাইন এ আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আশরাফুল আলম।
আর কোনো মামলায় আটকাদেশ না থাকায় শিরীন শারমিনের কারামুক্তিতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মিজবাহ। তিনি বলেন, `শিরীন শারমিন চৌধুরীর আর কোনো মামলায় আটকাদেশ নাই। আমরা জামিননামা দাখিল করব। আজ অথবা কালই তিনি কারামুক্ত হবেন বলে আশা করছি।`
আসামির পক্ষে জামিন চেয়ে শুনানিতে আইনজীবী ইবনুল কাওসার বলেন, `মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্পর্কে একটা শব্দও নাই। এজাহারে শুধু তার নামটায় আছে। তার কোয়ালিফিকেশন সম্পর্কে সবাই জানেন।`
তিনি আরও বলেন, `তিনি অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর কোনো ট্রিটমেন্ট নিতে পারেননি। আত্মগোপনে ছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি হার্ট অ্যাটাক করেন। ৬ মাস পর পর চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হয়।`
`কিন্তু ২০২৪ সালের ১১ জুনের পর চিকিৎসার জন্য আর বাইরে যেতে পারেননি। তার ১০ রকমের ওষুধ খেতে হয়। সবগুলো দেশেও পাওয়া যায় না। তিনি শারীরিক, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। রেটিনাপ্যাথির জন্য তার চোখ আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে।`
আইনজীবী ইবনুল কাওসার আরও বলেন, `৫ অগাস্টের আগের কোনো প্রেসক্রিপশন তার কাছে নেই। কারণ জীবন নিয়ে পালিয়েছিলেন। কিছু প্রেসক্রিপশন অনলাইন থেকে তোলা হয়েছে। তার চিকিৎসা করা না হলে জীবন হুমকির মুখে পড়বে।`
তিনি বলেন, `অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে। তিনি একজন নিরপেক্ষ মানুষ। মহিলা মানুষ, তিনি প্রিভিলাইজ ডিজার্ভ করেন। মেডিকেল গ্রাউন্ডে দয়া না করলে জীবন হুমকির মুখে পড়ে যাবে। যেকোনো সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে।`
জামিন আবেদনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, `তিনি একজন অবৈধ এমপি, একজন অবৈধ স্পিকার। তিনি শেখ হাসিনাকে সমর্থন করে ফ্যাসিস্ট বানাতে সহযোগিতা করেছেন। যখন আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনে হামলা করে, তখন তিনি সংসদ ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন।`
তিনি আরও বলেন, `এই মামলার এজাহারনামীয় আসামি। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলাটি তদন্তনাধীন আছে। উনার চেয়ে আরও বয়স্ক আসামি জেলখানায় আছে। জেলকোড অনুযায়ী চিকিৎসা দিচ্ছি। তারা চিকিৎসা নিয়ে ভাল আছেন।`
`এখানে অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতির মামলা না; আন্দোলনকারীদের দমনে নির্বিচারে গুলি করা হয়। এতে আশরাফুল নামে এক ব্যক্তি আহত হন। এই ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ত রয়েছে। তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করার প্রার্থনা করছি। জামিন পেলে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।`
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন মঞ্জুর করে।
আদেশে বিচারক বলেন, `তিনি একজন সাবেক স্পিকার। ঘটনার সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন অসুস্থ মানুষ। ৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত জামিন মঞ্জুর করা হলো।`
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দৃশ্যপটে ছিলেন না শিরীন শারমিন। গত ৭ এপ্রিল ভোরে ধানমন্ডির ৮/এ রোডের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
সেদিন পুলিশের তরফে তার দুই দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। অন্যদিকে শিরীন শারমিনের পক্ষে জামিনের আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী। আদালত আবেদন দুটি নাকচ করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিল।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকালে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে আন্দোলন চলছিল। সেখানে দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। একটি গুলি আশরাফুল ওরফে ফাহিমের চোখে লাগে। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।
এ ঘটনায় গত বছরের ২৫ মে শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনের নাম উল্লেখ এবং অচেনা ১১৫-১২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আশরাফুল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরদিনই সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া হলেও স্পিকারের পদ তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হয় না। পরবর্তী স্পিকারের শপথ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থেকে যান। তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২৭ দিনের মাথায় ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন।
২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসাবে জাতীয় সংসদে আসেন শিরীন। তাকে দেওয়া হয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব।
নবম সংসদের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেই জায়গায় আসেন তখনকার স্পিকার আবদুল হামিদ। এরপর ২০১৩ সালে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। তারপর থেকে তিন মেয়াদে তিনিই টানা স্পিকারের চেয়ারে ছিলেন।