শনিবার ১ অক্টোবর ২০২২
      Beta
ফাইনালে গোলের পর আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়ের উচ্ছ্বাস। ছবি: সংগৃহীত

স্বাগতিক হয়ে যে ছয়টি দেশ ফুটবলের বিশ্বকাপ জিতেছিল

মৃত্তিকা মৃন্ময়ী রহমান
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১০:১৯:০০ অপরাহ্ন | সর্বশেষ

ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ’ বা মর্ত্যের মাঝে মহা আয়োজন। এই সুবিশাল ক্রীড়াযজ্ঞের আয়োজক হওয়াও বড় এক গৌরবের বিষয়। আর এই গৌরব ইতিহাস সৃষ্টি করে যখন আয়োজক দেশটি বিশ্বকাপই জিতে নেয়। আয়োজক হওয়ার নানা সুবিধা আছে। চাপও আছে। এসব চাপ কাটিয়ে ইতিহাসে যে ছয়টি দেশ আয়োজক হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল তাদের নিয়েই আজকের এই রিপোর্ট।

“গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ” খ্যাত বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের জন্য মুখিয়ে থাকে ফিফার সদস্যপদ থাকা অনেক দেশই। শেষ পর্যন্ত যারা আয়োজক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে, তাদের আনন্দ দেখে মনে হয় তারা যেন সোনার খনিই পেয়ে গিয়েছে। জাতীয় গৌরব থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সবই এর পেছনে কাজ করে।

যেকোনো খেলার মতো ফুটবলেও “হোম অ্যাডভান্টেজ” নামের একটা মিথ প্রচলিত রয়েছে। অন্যান্য দলের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশও চায় সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে। সে কারণে অন্য সব টুর্নামেন্টের মতো ফিফা বিশ্বকাপের স্বাগতিকরাও চায় ঘরের মাঠের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিতে।

কিন্তু শুধু ঘরের মাঠের সুবিধা থাকলেই যে বিশ্বকাপ জেতা যাবে, এমন ভাবনা পুরোই নিরর্থক। স্বাগতিক হলেও বিশ্বকাপ জেতার জন্য প্রয়োজন দুর্দান্ত একটি স্কোয়াড, খেলোয়াড়দের মধ্যে দলীয় সমন্বয় এবং মূল টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা। এগুলো ছাড়া যে শুধু আয়োজক হওয়ার শক্তি দিয়েই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া অসম্ভব, তার প্রমাণ বিগত আসরগুলোই।

এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ঘুরেফিরে ১৬টি দেশ আয়োজক হয়েছে। তবে টুর্নামেন্ট শেষে চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছে মাত্র ৬টি স্বাগতিক দেশ। ঘরের মাঠে নিজেদের দর্শকের সামনে কোন ছয়টি দল বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে পেরেছে— দেখে নেওয়া যাক।

1 world-champion-1930-uruguay

১৯৩০ সালে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপই নিজেদের করে নেয় উরুগুয়ে দল। ছবি: সংগৃহীত

১৯৩০: উরুগুয়ে

৯২ বছর আগে উরুগুয়েতে বসেছিল প্রথম বিশ্বকাপের আসর। তখন অবশ্য টুর্নামেন্টের নাম ছিল জুলেরিমে কাপ আর শিরোপার নাম ছিল জুলেরিমে ট্রফি। লাতিন আমেরিকায় আয়োজিত সেই আসরে অনেক ইউরোপীয় দেশই অংশ নেয়নি।

প্রথমবারের মতো আয়োজিত বিশ্বকাপে নিজেদের দর্শকের সামনে শিরোপা জেতার আনন্দ উপভোগ করেছিল স্বাগতিক উরুগুয়েই। গ্রুপপর্বে পেরুকে ১-০ আর রোমানিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পা রাখে আয়োজকরা।

শেষ চারের লড়াইয়ে যুগোস্লাভিয়াকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় উরুগুয়ে। ফাইনালে আরেক লাতিন আমেরিকান পরাশক্তি আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় উরুগুইয়ানরা।

১৯৩৪: ইতালি

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরও স্বাগতিকদের গলায় পড়িয়েছিল বিজয়ের মালা। আর সেই বিজয়ী ছিল ইতালি। ১৯৩৪ সালে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপে অংশ নিতে দলগুলোকে পেরোতে হয়েছিল বাছাইপর্বের বাধা। আগেরবারে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিশ্বকাপ বয়কটের প্রতিবাদে এবার বিশ্বকাপ বর্জন করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে।

১৬ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব বলে কিছু ছিল না। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলকেই খেলতে হয়েছিল নকআউট ম্যাচ। শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্রকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ঘরের মাটিতে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে ইতালি। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের সঙ্গে প্রথম দেখায় ১-১ গোলে ড্র করে স্বাগতিকরা।

2. 1934-italy

দেশের মাটিতে ১৯৩৪ বিশ্বকাপ জয়ের পর ইতালির উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

তখনকার সময়ে টাইব্রেকার না থাকায় পুনরায় দুই দলের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১-০ গোলের জয়ে সেমিফাইনালে চলে যায় ইতালি। শেষ চারের লড়াইয়ে অস্ট্রিয়াকেও একই ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপার খুব কাছাকাছি চলে যায় আয়োজকরা। পরে ফাইনালে অতিরিক্ত সময় শেষে চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে পরাজিত করে নিজেদের দর্শকের সামনেই বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে ওঠে আজ্জুরিরা।

১৯৬৬: ইংল্যান্ড

প্রায় দুই যুগ পর আবারও ফিফা বিশ্বকাপের স্বাগতিক দল শিরোপা জিতে নেয়। সেবারের আয়োজক ছিল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ ফুটবলের ৯২ বছরের ইতিহাসে ওই একবারই টুর্নামেন্ট আয়োজনের গুরুদায়িত্ব পেয়েছিল ইংলিশরা। আর তাতেই তারা করেছিল বাজিমাত।

গ্রুপপর্বে উরুগুয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও পরের দুই ম্যাচে মেক্সিকো আর ফ্রান্স দুদলের বিরুদ্ধেই ২-০ গোলের জয়ে প্রথম রাউন্ডের বৈতরণী পার হয় ইংল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ চারেও পা রাখে স্বাগতিকরা।

3 world-champion-1930-uruguay

১৯৬৬ সালে নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর ইংল্যান্ড দলের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিলে বিশ্বকাপ অভিষেকেই সেবার চমকে দেওয়া পর্তুগাল। তবে পর্তুগিজদের ২-১ গোলে হারিয়ে ঠিকই ফাইনালে চলে যায় আয়োজকরা। ঘরের মাঠে অতিরিক্ত সময় শেষে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ৪-২ গোলের জয়ে ঘরের মাটিতে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ জিতে নেয় ইংলিশরা।

১৯৭৪: পশ্চিম জার্মানি

আট বছর আগে স্বাগতিকদের কাছে হেরে পশ্চিম জার্মানি দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। তবে ১৯৭৪ সালে নিজেদের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপ জিতে সেই শোকমচন করে তারা।

১৯৭৪ বিশ্বকাপটি ছিল নতুন যুগের শুরু। আগের আসরে তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জেতায় জুলেরিমে ট্রফিটি চিরতরে নিয়ে নেয় ব্রাজিল। ফলে পরের আসরে নতুন নাম এবং ট্রফি নিয়ে আয়োজিত হয় ফুটবলের বিশ্বযজ্ঞ।

ঘরের মাঠে আয়োজিত সেই টুর্নামেন্টে গ্রুপপর্বে প্রথম দুই ম্যাচে চিলিকে ১-০ আর অভিষিক্ত অস্ট্রেলিয়াকে ৩-০ গোলে হারায় পশ্চিম জার্মানি। শেষ ম্যাচে পূর্ব জার্মানির কাছে ০-১ গোলে হেরে গেলেও তাই নকআউট পর্বে যেতে সমস্যা হয়নি স্বাগতিকদের।

4 world-champion-

১৯৭৪ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারানোর পর বিশ্বকাপ জেতা পশ্চিম জার্মানি। ছবি: টুইটার

ফরম্যাট অনুযায়ী দ্বিতীয় রাউন্ডে পশ্চিম জার্মানির গ্রুপসঙ্গী ছিল পোল্যান্ড, সুইডেন এবং যুগোস্লাভিয়া। তিন দলের বিপক্ষে যথাক্রমে ১-০, ৪-২ আর ২-০ গোলের জয়ে গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবেই ফাইনালে পা রাখে আয়োজকরা।

শিরোপা নির্ধারণী সেই লড়াইয়ে পশ্চিম জার্মানির প্রতিপক্ষ ছিল যুগান্তকারী টোটাল ফুটবল দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নেদারল্যান্ডস। সেখানে প্রথম মিনিটেই পিছিয়ে পড়েও অরেঞ্চজদের ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানরা।

Argentina 1978-fifa-world-cup

১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের উচ্ছাস। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৮: আর্জেন্টিনা

১৯৫০ সালে ঘরের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে শেষ হাসি হাসতে পারেনি ব্রাজিল। তবে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ আয়োজন করে তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ঠিকই শেষ হাসি হাসে। যদিও সেই বিশ্বকাপ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তবে তাতে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা ম্লান হয়ে যায়নি।

গ্রুপপর্বে প্রথম দুই ম্যাচে হাঙ্গেরি এবং ফ্রান্স দুদলকেই ২-১ গোলে হারিয়ে শুভ সূচনা করে আর্জেন্টিনা। শেষ ম্যাচে ইতালির কাছে ০-১ গোলে হেরেও প্রথম রাউন্ডের বৈতরণী পেরিয়ে যায় স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার গ্রুপসঙ্গী ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল, পোল্যান্ড এবং পেরু।

প্রথম ম্যাচে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-০ গোলের জয় পেলেও পরের ম্যাচে ব্রাজিলের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় আর্জেন্টিনা। ঘরের মাটিতে বিশ্বকাপ স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে শেষ ম্যাচে পেরুর বিরুদ্ধে আলবিসেলেস্তেদের প্রয়োজন ছিল চার গোলের ব্যবধানে জয়।

পেরুর বিপক্ষে সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৬-০ গোলের জয় তুলে নিয়ে ১৯৩০ বিশ্বকাপের পর আবার ফাইনালে পা রাখে। পরবর্তীতে ফাইনালে অতিরিক্ত সময় শেষে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের দর্শকের সামনে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় আকাশী-সাদা শিবির।

france

১৯৯৮ বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৮: ফ্রান্স

সেবার দীর্ঘ ৬০ বছর পর বিশ্বকাপের আয়োজক হয় ফ্রান্স। ১৯৩৮ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের স্বাগতিক হয়ে আয়োজনটিকে স্মরণীয় করে রাখে লেস ব্লুজরা। ৩২ দিন ধরে চলা টুর্নামেন্ট শেষে শিরোপাও ওঠে ফরাসিদের হাতেই।

প্রথম রাউন্ডে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৩-০, সৌদি আরবকে ৪-০ এবং ডেনমার্ককে ২-১ গোলে পরাজিত করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই শেষ ষোলোতে পা রাখে ফ্রান্স। দ্বিতীয় পর্বে গোলশূন্য নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময় শেষে ১-০ গোলে জয়লাভ করে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় আয়োজকরা।

কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ ছিল আগেরবারের রানার্সআপ ইতালি। নির্ধারিত ৯০ মিনিট অতিরিক্ত সময়ও গোলবিহীন অমিমাংসিতভাবে শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৪-৩ গোলের ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে পৌঁছায় ফরাসিরা।

শেষ চারের লড়াইয়ে সেবারের অভিষিক্ত চমক জাগানিয়া ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠে ফ্রান্স। শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ঘরের মাঠে নিজদের দর্শকের সামনে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয় লেস ব্লুজরা। সেবারই সর্বশেষবারের মতো কোনো স্বাগতিক দলের হাতে ওঠে বিশ্বকাপ ট্রফি।