হরমুজ খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ৬ শর্ত

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

আগস্ট ৯, ২০২৬, ০৭:১১ পিএম

হরমুজ খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ৬ শর্ত

ছবি: সংগৃহীত

একটি জলপথ, কিন্তু যুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির ক্ষেত্র। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্নে ইরান এবার এমন কয়েকটি শর্ত সামনে এনেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেওয়া সহজ নয়।

ওয়াশিংটন চায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হোক। তবে তেহরানের অবস্থান, শুধু প্রণালি খুলে দেওয়ার আলোচনা নয়—এর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের নীতি ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থাৎ, হরমুজকে এখন কেবল একটি নৌপথ হিসেবে নয়, বরং চাপ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর জানিয়েছেন, হরমুজ খুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আর কখনো ইরানকে হুমকি দেওয়া যাবে না এবং ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।

এর পাশাপাশি ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া এবং যুদ্ধে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার ‘সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ দেওয়া।

এ ছাড়া ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ‘নিঃশর্তভাবে’ ছেড়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তেহরান। সবশেষে ভবিষ্যতে ইরানকে সামরিকভাবে হুমকি না দেওয়ার নিশ্চয়তাকেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শর্ত হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে।

ইরানের এসব দাবি সামনে আসায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এরই মধ্যে হরমুজ পরিচালনা ও নৌযান চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলাদা আলোচনা এগিয়ে চলছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, নৌযান চলাচল এবং বিশেষ করে কোন পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে—এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রায় হয়ে এসেছে। তবে হরমুজ খুলে দেওয়ার বিষয়টি কেবল জাহাজ চলাচলের পথ নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দাবিগুলোও।

যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি ছিল আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান হরমুজকে নিজেদের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তৈরি হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে হলে ওয়াশিংটনকে ইরানের সঙ্গে কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। কিন্তু তেহরানের বর্তমান দাবিগুলো মেনে নেওয়ার অর্থ শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলে দেওয়া নয়; এর মাধ্যমে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্জনও স্বীকার করে নেওয়া হতে পারে।

অন্যদিকে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতেও।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এখন আর কেবল একটি নৌপথ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শক্তি, কৌশল ও রাজনৈতিক প্রভাবের পরীক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের ছয় দাবির কতটা মেনে নিয়ে ওয়াশিংটন হরমুজ খুলতে রাজি হবে, আর তেহরানই বা কতটা চাপ ধরে রাখতে সক্ষম হবে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণই হয়তো সংঘাতে দুই পক্ষের শক্তির পরবর্তী হিসাব নির্ধারণ করবে।

Link copied!