জিন প্রযুক্তি: চিকিৎসায় সেরে গেলো ব্লাড ক্যানসার!

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

ডিসেম্বর ১১, ২০২২, ০৮:০৭ পিএম

জিন প্রযুক্তি: চিকিৎসায় সেরে গেলো ব্লাড ক্যানসার!

ইংল্যান্ডের লেস্টার শহরের ১৩ বছরের কিশোরী এলিসা। গত বছরের মে মাসে তার দেহে ধরা পড়ে টি-সেল একিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া। ক্যানসারের কোষগুলো দ্রুত ছড়িয়ে চলে গিয়েছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কেমোথেরাপি এবং বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করেও সেগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছিল না।

এলিসা বলেন, 'আমি হয়তো আসলে মারাই যেতাম।' গত বছর হয়তো মেয়ের সাথে শেষ ক্রিসমাস পালন করতে যাচ্ছেন ভেবেছিলেন এলিসার মা কিওনা।

এরপর যা ঘটেছে কয়েক বছর আগেও তার সবই ছিল অচিন্তনীয়। জিন প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি রক্ষা করেছে এলিসার জীবন।

অত্যাধুনিক সেল ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন এক চিকিৎসার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নিরাময়ের অযোগ্য ব্লাড ক্যানসার বা লিউকেমিয়া রোগ সারিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন যুক্তরাজ্যের ডাক্তাররা।

এই পদ্ধতিতে কোষের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সেগুলো রোগীর দেহের ক্যানসার সেলগুলোকে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব কোষ ক্যানসার সেলগুলোকে টার্গেট করে আক্রমণ চালায় এবং ভালো কোষের ক্ষতি না করেই সেগুলোকে নির্মূল করে।

এলিসার দেহে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা চালিয়ে ক্যানসার দূর করা হয়েছে। এর আগে লিউকেমিয়ার প্রচলিত সব চিকিৎসা পদ্ধতি তার দেহে ব্যর্থ হয়েছিল। পরীক্ষামূলকভাবে নতুন ওষুধটি প্রয়োগের পর তার দেহে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে এবং তার দেহের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এলিসার দেহে জিনগত পরিবর্তনের যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এই পদ্ধতির নাম ‘বেস এডিটিং।’ এই চিকিৎসা বিজ্ঞানে খুব দ্রুত অগ্রগতি ঘটছে এবং নানা রোগের চিকিৎসায় এই পদ্ধতির সফল হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের ডাক্তাররা ‘বেস এডিটিং’ পদ্ধতিতেই এলিসাকে লিউকেমিয়া থেকে সারিয়ে তুলেছেন। ওষুধ প্রয়োগের তিন মাস পর এলিসার দেহে ক্যানসারের কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও সবশেষ দুটো পরীক্ষায় সেগুলো দেখা যায়নি।

গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের ডাক্তাররা যে বেস এডিটিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন সেটি মাত্র ছয় বছর আগে উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক কোডের একটি বিশেষ অংশকে আকারে বড় করেন এবং পরে এর মলিকুলার বা আণবিক গঠনে পরিবর্তন আনেন। এভাবে এর জেনেটিক নির্দেশনা বদলে দেওয়া হয়।

একজন দাতার কাছ থেকে সুস্থ টি-সেল নিয়ে তাতে জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সেগুলো এলিসার শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যা তার দেহের ক্যানসার সেলগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। টি-সেল হচ্ছে শরীরের অভিভাবকের মতো। এই সেল শরীরের ভেতরে হুমকি সৃষ্টিকারী উপাদান ধ্বংস করে দেয়।

টি-সেলের বেস এডিটিং-এর কারণে এসব সেল এলিসার দেহের সুস্থ কোষেরও কোনো ক্ষতি করবে না।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চিকিৎসা পদ্ধতি সফল হলে দ্বিতীয় বোন-ম্যারো প্রতিস্থাপনের পর এলিসার দেহের টি-সেলসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনর্গঠিত হবে।

এই গবেষণার সাথে যুক্ত থাকা ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এবং গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের অধ্যাপক ওয়াসিম কাসিম বলেছেন, ‘এলিসাই প্রথম রোগী যাকে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘জেনেটিক মেনিপুলেশন বিজ্ঞানে খুব দ্রুত অগ্রগতি ঘটছে। এবং নানা ধরনের রোগ সারিয়ে তোলার ব্যাপারে এর অপরিসীম সম্ভাবনা রয়েছে।’

এলিসা এখন ক্যানসার থেকে মুক্ত। চিকিৎসার জন্য ১৬ সপ্তাহ হাসপাতালে ছিল সে। তবে রোগটি আবারও ফিরে আসে কি না- এই আশঙ্কায় তাকে এখনও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

‘এটা দারুণ ঘটনা যে আমি এই সুযোগ পেয়েছি। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে অন্য শিশুরা এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে উপকৃত হবে,’ বলেন এলিসা। 

এলিসা ছাড়াও আরও নয়জন রোগীর ওপর এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা পরীক্ষা চালানো হবে বলে জানান চিকিৎসকরা।

Link copied!