জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম
ছবি: বিসিবি
যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর কোনো হামলা চালায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানো হবে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানান। ইরান ইন্টারন্যাশনালের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে জানিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে ওই দেশগুলোর মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইরান এসব দেশকে ওয়াশিংটনকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে অনুরোধ জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে ধারাবাহিকভাবে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন। মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তাহলে ‘খুব শক্ত প্রতিক্রিয়া’ দেখা যাবে। তিনি বলেন, যদি তারা তাদের ঝুলিয়ে দেয়, তাহলে আপনারা কিছু দেখতে পাবেন। একই দিনে তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো দখল নিতে—‘হায়তা আসছে।’
রয়টার্সকে তিনজন মার্কিন কূটনীতিক জানান, অঞ্চলটির প্রধান মার্কিন বিমানঘাঁটি কাতারের আল উদেইদ থেকে কিছু কর্মীকে সরে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন বলেন, এটি ‘আদেশমূলক সরিয়ে নেওয়া’ নয়, বরং একটি ‘পজিশন পরিবর্তন’। তবে গত বছর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে যেভাবে বড় পরিসরে সেনা সরানো হয়েছিল, এবার তেমন কোন আলামত দেখা যায়নি।
দোহার মার্কিন দূতাবাস ও কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ গড়িয়েছে তৃতীয় সপ্তাহে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ২,৪০৩ বিক্ষোভকারী এবং সরকার-সংশ্লিষ্ট ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ২,০০০। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি সরকারের বিরুদ্ধে ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বড় বিক্ষোভ আন্দোলন।
বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও ইরানি কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেংগাও জানায়, কারাজ শহরে গ্রেফতার হওয়া ২৬ বছর বয়সি বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির বুধবার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে শাস্তি কার্যকর হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করা যায়নি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে বিষয়টি যাচাই করতে পারেনি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘ভিন্নমত দমন’ ও ‘ভয় দেখাতে’ দ্রুত বিচার ও নির্বিচার মৃত্যুদণ্ডের পথে হাঁটতে পারে। সংগঠনটির তথ্যানুসারে, ৮ জানুয়ারি থেকে ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যে এরফান সোলতানির সঙ্গে তার পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং ১১ জানুয়ারি কর্তৃপক্ষ পরিবারকে জানায় যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন, ‘পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে’ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে—কাতারের আল উদেইদে সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরসহ।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে উসকানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে অংশগ্রহণকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এদিকে, সোমবার তেহরানে সরকারপন্থী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যা খামেনি প্রশাসনের প্রতি আনুগত্যের প্রদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীতে ভাঙনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এই অস্থিরতা শুরু হওয়ায় এবারের পরিস্থিতি আগের বিক্ষোভগুলোর তুলনায় ভিন্ন ও আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।