জোসেফ গোয়েবলস: যার মাধ্যমে ‘প্রোপাগান্ডা’পেয়েছে বিশ্ব পরিচিতি

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

মে ১, ২০২৩, ০৫:১৪ পিএম

জোসেফ গোয়েবলস: যার মাধ্যমে ‘প্রোপাগান্ডা’পেয়েছে বিশ্ব পরিচিতি

‘আপনি যদি একটি মিথ্যা বলেন এবং সেটা বারবার সবার সামনে বলতে থাকেন তাহলে লোকজন একসময় সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করবে।’ জার্মানিতে তা-ই হয়েছিল। আর বিখ্যাত এই উক্তি যার, তিনি হলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম খলনায়ক এডলফ হিটলারের প্রধান সহযোগী ও একনিষ্ট অনুসারী, নাৎসী নেতা পল জোসেফ গোয়েবলস। তিনি ছিলেন হিটলারের “মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট এন্ড প্রোপাগান্ডা’র মন্ত্রী।

যুদ্ধের ময়দানে ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানো একটি অন্যতম রণকৌশল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমরা এটির নেতিবাচক প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায় ব্রিটিশদের মধ্যে। ওই সময় ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম অনেক বড় পরিসরে এবং সুশৃঙ্খলভাবে প্রোপাগান্ডাকে নেতিবাচকরূপে ব্যবহার করে। ওই যুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের জন্য ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডাকে দায়ী করেছিলেন হিটলার। কিন্তু দুই দশকের ব্যবধানে তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর হয়ে ব্রিটিশদের ওই কৌশলই কাজে লাগান। গঠন করেন “মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট এন্ড প্রোপাগান্ডা”। ওইসময় আর  নাৎসি বাহিনীর পক্ষে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে সারাবিশ্বজুড়ে যিনি পরিচিতি লাভ করেন তিনি ছিলেন ওই মন্ত্রণালয়ের প্রধান জোসেফ গোয়েবলস।

ঔপন্যাসিক, লেখক, নাট্যকার, সাংবাদিক ও রাজনীতিক। একাধিক বিশেষণে তিনি বিশেষিত হলেও তার হাত ধরেই প্রোপাগান্ডা একটি শৈল্পিক মর্যাদায় উন্নীত হয়। “দ্য লিটল ডক্টর ”নামে পরিচিত হিটলারের প্রধান এই অনুচর ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। এখনো পৃথিবীজুড়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক জনপ্রিয় “গোয়েবলসীয় কায়দা”-রাজনতিক নেতা-নেত্রীদের মুখ থেকে যা ব্যাপকভাবে শোনা যায়।

ভয়ঙ্কর এই মিথ্যাবাদী জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য ও ইতিহাসে পড়াশোনা শেষ করে ১৯২১ সালে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন ।  লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। একটি উপন্যাস ও বেশ কয়েকটি নাটকও লিখেছিলেন। তবে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য প্রকাশকরা তা ছাপাতে অস্বীকার করে। ফলে লেখক হিসেবে সফল হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়। পরে সাংবাদিক হিসেবেও বার্লিনে কিছুদিন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন তিনি।

১৮৯৭ সালের ২৯ অক্টোবর জার্মানির রিদত শহরে জন্ম নেওয়া গোয়েবলসের বয়স যখন সাত বছর, তখন একটি অপারেশন সফল না হওয়ায় তার বা পায়ে সমস্যা দেখা দেয়। আর একারণে তিনি সারা জীবন খুড়িয়ে হাঁটতেন। গোয়েবলস সম্পর্কে তার ২০১৬ সালে ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে গোয়েবলসের অন্যতম সেক্রেটারি পোমসেল বলেন, ”অতি ভদ্র, সজ্জন একজন মানুষ থেকে বর্বর মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার দক্ষতা তার থেকে বেশি কারো ছিল না। অফিস তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ কিন্তু বাহিরের পৃথিবীতে ঠিক তার উল্টো।”

হিটলারের মতো প্রচণ্ড ইহুদীবিরোধী ছিলেন গোয়েবলস। ১৯৩৩-৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি জার্মানির তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রধান থাকার সময় ইহুদিবিরোধী তৎপরতার জন্য তিনি কুখ্যাত ছিলেন। তার পরামশেই জার্মানিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক হামলা শুরু সেখানে ব্যাপক ইহুদি হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়।

গোয়েবলস বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মিডিয়া বা গণমাধ্যমের ‘নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার’ খুবই দরকার। তাইতো এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “সংবাদমাধ্যমকে একটি বিশাল কীবোর্ড হিসেবে চিন্তা করুন যার উপর সরকার ইচ্ছামতো বাজাতে পারে।”

যুদ্ধের ময়দানে মিথ্যাচার খুবই দরকার এটা হিটলারকে বুঝাতে পেরেছিলেন গোয়েবলস। তারই পরামর্শে হিটলার প্রতিষ্ঠা করেন ‘মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট এন্ড প্রোপাগান্ডা। আর এর প্রধান হন গোয়েবলস।

গুজব মন্ত্রণালয়ের প্রধান হয়েই মিডিয়াকে সরকারের পক্ষে আনতে কাজ করেন গোয়েবলস। ওই সময় জনপ্রিয়  ছিল রেডিও। গোয়েবলস বিনামূল্যে জার্মানির প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে রেডিও দেন যেখানে শুধু প্রচার হতো হিটলারের প্রশংসা ও স্তূতি। ইহুদি নিধনের সময় প্রচার করা হতো জার্মানিতে হিটলারের মতো শক্তিশালী একজনকে দরকার। তিনিই পারবেন জার্মান জাতিকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে। সম্প্রচারের বেশির ভাগ জুড়ে থাকতো হিটলারের সাফল্য নিয়ে। বেতারে এ প্রচারণা বারবার শুনতে শুনতে মানুষ বিশ্বাসও করত। ডাহা মিথ্যাকে জলজ্যান্ত সত্যে পরিণত করার ব্যাপারে গোয়েবলসের নীতি ছিল, কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক, মিথ্যাটাকে অবিরাম প্রচার করে যান। একসময় পাবলিকের কাছে তা সত্যি বলেই মনে হবে।'

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপকভাএব বেড়ে যায় প্রোপাগান্ডা মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা। জার্মান যখন পোল্যান্ড আক্রমণ করেন, তখন আক্রমণের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে জার্মানদের মধ্যে পোল্যান্ডবিদ্বেষ ছড়িয়ে দেন। এতে দেশটির জনগণ পোল্যান্ড আক্রমণকে সমর্থন জানায়। যুদ্ধের প্রথম দিকে

জার্মান বাহিনীর সফলতা অতিরঞ্জিত করে মিডিয়াতে প্রকাশ করতে থাকেন গোয়বেলস। তাঁর পরিকল্পনায় পুরো দেশে বানানো হয় অসংখ্য শর্টফিল্ম। এসব শর্টফিল্মে তুলে ধরা হয় যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা, বিভিন্ন  যুদ্ধে জার্মান বাহিনীর সাহসিকতার মনগড়া কাহিনী। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়কে পাল্টিয়ে প্রচার করেন জার্মান বিজয়ের। এর ফলে বিশ্ববাসী যেখানে  যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে ছিল শংকিত, সেখানে জার্মান জনগণ হিটলারকে অন্ধের মতো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এক্ষেত্রে বলা যায় পুরোটাই গোয়েবলসের অবদান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের  শেষের দিকে যখন রুশ সেনাদের হাতে জার্মান সেনারা নাস্তানাবুদ তখনও গোয়েবলস প্রচার করেন, ‘সোভিয়েত রাশিয়া তাদের দখলে। জার্মান সেনারা রাশিয়ান ভদকা পান করছে। আর রাশিয়ান মেয়ে নিয়ে আনন্দফুর্তি করছে।’ প্রতিদিনই এ ধরনের প্রচারণা চলতো।  মার্কিন আর ব্রিটিশ  সেনাদের বিরুদ্ধে চলত কুৎসা রটনা যারা কোনো ভিত্তি ছিল না।

১৯৪৫ সালের শুরুতে সোভিয়েত ও মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা যখন রাইন নদী অতিক্রম করে তখনই হিটলার বুঝতে পারেন তার জার্মানি পরাজয় বরণ করতে চলেছে। এসময় সহজ উপায়ে আত্মসমর্পনের জন্য অন্যান্য নাৎসি নেতা যখন মিত্রবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করছিলেন টিক সেই সময়ও হিটলার ও গোয়েবলস শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিন্ধান্ত নেন। পরাজয় অবসম্ভিক জেনে অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিলে হিটলার সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেন। এর আগে তিনি গোয়েবলকে চ্যান্সেলর নিযুক্ত করে যান। তবে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন তিনি।

গোয়েবলসের শেষ পরিণতি ছিল করুণ। ১৯৪৫ সালের এদিনে (১ মে) হিটলারকে দাহ করে এসে প্রথমে নিজের ছয় ছেলেমেয়ে ও সৎ ছেলেকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। পরে স্ত্রীকে গুলি করে মারেন। সবশেষে নিজের নেতার (হিটলার) মতোই আত্মহত্যা করেন গোয়েবলস।

 

বেঁচে না থাকলেও পৃথিবীতে প্রোপাগান্ডাকে একটি জনপ্রিয় এবং বিপদজনক অস্ত্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে বহুলাংশে সফল হয়েছেন গোয়েবলস। আর তাই দেখা যায়, গত কয়েক দশকে পুঁজিবাদী এবং যুদ্ধবাজ নেতারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে যত যুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ করেছেন তার বৈধতা দানের জন্য হেঁটেছেন গোয়েবলসেরই দেখানো পথেই। তার শেখানো ও দেখানো পথে হেঁটেই যুদ্ধবাজ নেতারা সফল হয়েই অর্জন করে নিয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন। তাই যতদিন ‘প্রোপাগান্ডা’ (মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার) থাকবে ততদিন ‘গোয়েবলস’ নামটিও অমর থাকবে।

Link copied!