ফাইল ছবি
আজ থেকে ঠিক ৩০ বছর আগে, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ঢালিউডে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। মাত্র ২৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ঢাকাই চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ।
তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে তৈরি হয়েছিল এক অপূরণীয় শূন্যতা। সময়ের হিসাবে আজ সেই শূন্যতার তিন দশক পূর্ণ হলো। অথচ এত বছর পরও দর্শকের হৃদয়ে সালমান শাহ রয়ে গেছেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক রাজপুত্র হয়ে।
সালমান শাহর পারিবারিক নাম শাহরিয়ার চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরীর বড় সন্তান ছিলেন সালমান শাহ।
ছোটবেলা থেকেই গান, মডেলিং ও অভিনয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তার। শিশুদের বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও নিয়মিত দেখা যেত তাকে।
চলচ্চিত্রে সালমান শাহর আগমনটা ছিল অনেকটাই আকস্মিক। শুরুতে অভিনয়কে তিনি পেশা হিসেবে নয়, বরং শখ হিসেবেই দেখেছিলেন। এমনকি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবে পরিবারেরও প্রথম দিকে আপত্তি ছিল। পরে পরিবারের সম্মতি নিয়েই রুপালি পর্দায় পা রাখেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, পেশাদার শিল্পী হিসেবে সিনেমায় অভিনয় করবেন, তা কখনো কল্পনাও করেননি।
কিন্তু সেই ‘হঠাৎ’ শুরুই বদলে দেয় তার জীবন এবং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস।
নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্রে এসে সালমান শাহ শুধু নায়কোচিত অভিনয় দিয়েই দর্শকের মন জয় করেননি, ফ্যাশনেও তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক ধারা। ব্যান্ডানা, সানগ্লাস, টি-শার্ট, জিনস কিংবা বাইক—তার প্রতিটি উপস্থিতিই হয়ে উঠেছিল তরুণ প্রজন্মের অনুকরণের বিষয়।
সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়া তার পোশাক-পরিচ্ছদ ও স্টাইল ছিল অনেকটাই আধুনিক। পরবর্তী সময়ে তার সেই ফ্যাশন ভাবনার সঙ্গে বলিউডের নানা তারকার স্টাইলেরও মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। তাই অনেকের কাছেই সালমান শাহ ছিলেন বিনোদন জগতের এক ‘টাইম ট্রাভেলার’।
সালমান শাহর জনপ্রিয়তার মূল শক্তি ছিল শুধু পর্দার নায়কোচিত উপস্থিতি নয়। জাঁকজমকপূর্ণ তারকাখ্যাতির বাইরে সাদামাটা স্বভাব, প্রাণবন্ত হাসি এবং অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততায় খুব অল্প সময়েই কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।
নায়ক হিসেবে তার অভিনয় ও পর্দায় উপস্থিতি নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে এনে দিয়েছিল নতুন এক মাত্রা।
মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়ে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছিলেন সালমান শাহ। অল্প সময়েই হয়ে উঠেছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা।
কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার আকস্মিক মৃত্যু পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গনকে নাড়িয়ে দেয়। তার অকালপ্রয়াণ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কের বিদায় ছিল না, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করেছিল এক গভীর শূন্যতা।
তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে থাকা রহস্যের পুরোপুরি অবসান হয়নি। তার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। সময় গড়িয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু সেই প্রশ্নের ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটেনি।
তবে মৃত্যুর তিন দশক পরও সালমান শাহকে ঘিরে দর্শকের ভালোবাসায় কোনো ভাটা পড়েনি। নতুন প্রজন্মের কাছেও তার সিনেমা, অভিনয়, ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্ব সমানভাবে আকর্ষণীয়।
পর্দার সেই তরুণ নায়ক আজ আর নেই। কিন্তু অগণিত ভক্তের ভালোবাসা ও স্মৃতিতে তিনি আজও বেঁচে আছেন—অমলিন, অনন্য এবং চিরসবুজ এক সালমান শাহ হয়ে।