ছবি: এপি
ইরানি তেলবাহী তিনটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এর আগে তাদের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে ইরানের “সীমিত ও অরক্ষিত তেলবাহী বহর ধ্বংস” করতে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিধা করবে না।
আজ (রোববার) বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের আগের সামুদ্রিক হামলাগুলো বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে চালানোর পর নতুন এই হামলাকে বিপজ্জনক মাত্রার উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাতকে “ছোটখাটো ব্যাপার” হিসেবে আখ্যায়িত করার এক দিন পরই এসব হামলা চালানো হলো। গত ছয় মাস ধরে চলা অন-অফ যুদ্ধের মধ্যে এটি আবারও সরাসরি সংঘাতের দিকে মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর দুই পক্ষই সামরিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই একে অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। এদিকে শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে টহল দেওয়ার সময় একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ার “একাধিক বিনা উসকানির ইরানি হামলা” এড়িয়ে যায়। এতে কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি। তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠিক কখন ছোড়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের দুটি তেলবাহী জাহাজ “স্থায়ীভাবে অচল” করে দেওয়া হয়েছে এবং তৃতীয়, খালি ট্যাংকারটি ধ্বংস করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব ট্যাংকার এমন একটি গোপন নেটওয়ার্কের অংশ, যার মাধ্যমে ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং অঞ্চলটির সশস্ত্র মিত্রগোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন করা হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম পরে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং তিনটি মার্কিন জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে এ দাবি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের এক মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাহাজ চলাচলে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে মার্কিন সামরিক জাহাজের ওপর আরও “ভয়াবহ” হামলা চালানো হবে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিত্রিনোভিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বলেন, ইরান একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্য করেছে। তার মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে তেহরান এখন এমন ঝুঁকি নিতে ক্রমেই বেশি প্রস্তুত, যা আগে এড়িয়ে চলত। এর মধ্যে ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদগুলোর কয়েকটিকে সরাসরি হুমকি দেওয়াও রয়েছে।
এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছিল, খার্গ দ্বীপ থেকে প্রায় ৬ মাইল (১০ কিলোমিটার) দূরে থাকা একটি ট্যাংকারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। খার্গ দ্বীপে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল রয়েছে, যেখান থেকে দেশটির অধিকাংশ তেল রপ্তানি হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দ্বীপটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। মার্চে সেখানে থাকা সামরিক স্থাপনাতেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, একটি ট্যাংকারে খার্গ দ্বীপের কাছে এবং আরেকটিতে হরমুজ প্রণালীর পূর্বে জাস্কের কাছে হামলা চালানো হয়। খালি তৃতীয় ট্যাংকারটিতে ওমান উপসাগরে হামলা করা হয়। মার্কিন বাহিনী জানায়, জাহাজটির ক্রুদের “জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ” দেওয়া হয়েছিল। হামলার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন বিবৃতির পর ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরও দুই ট্যাংকারে হামলার খবর জানায় এবং বলে, জাহাজগুলোর ক্রুরা নিরাপদে সরে গেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, “আমরা মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করতে দ্বিধা করব না। প্রয়োজনে ইরানের সীমিত ও অরক্ষিত তেলবাহী বহর ধ্বংস করতেও দ্বিধা করব না।”
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব হামলাকে “যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তারা বলেছে, “অর্থনৈতিক যুদ্ধ”সহ যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আগ্রাসনের পরিণতির দায় ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের বহন করতে হবে।
যুদ্ধ এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ চলাকালে বিভিন্ন জাহাজ অচল হয়ে যাওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত কতটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। গত ৮ মে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, তারা দুটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারের ধোঁয়া নির্গমনের চিমনিতে “নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী অস্ত্র” নিক্ষেপ করেছে। দুটি জাহাজই তখন খালি ছিল।
সূত্র: এপি