জাতিসংঘ: বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একের পর এক ব্যর্থ যে বিশ্বসংস্থা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

অক্টোবর ২৪, ২০২২, ১২:০১ এএম

জাতিসংঘ: বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একের পর এক ব্যর্থ যে বিশ্বসংস্থা

২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ ৭৮ বছরে পা রাখছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি ১৯৪৫ সালের এই দিনে ৫১টি রাষ্ট্র মিলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৯৩। বাংলাদেশ এই সংস্থাটির ১৩৬ তম সদস্য দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় যে জাতিসংঘের যাত্রা শুরু, সেই সংস্থাটির সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে এখনো চলে তর্ক-বিতর্ক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতায় বিশ্বশান্তির কথা মাথায় রেখে সৃষ্টি হলেও বিশ্বসংগঠন জাতিসংঘ অনেকটাই ব্যর্থ।

কোনো সন্দেহ নেই ১৯৪৫ সালের বিশ্ব প্রেক্ষাপট থেকে আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ওই সময় সবচেয়ে ক্ষমতাধর পাঁচটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্স জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হয়। অন্য রাষ্ট্রগুলোর মর্যাদা হয় সাধারণ সদস্য। এই পাঁচ রাষ্ট্র কোনো বিষয়ে একমত না হলে, জাতিসংঘ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। যেহেতু এই নীতি চলমান থাকায় একমতও হওয়া যায় না, তাই বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ সফল হতে পারে না।

ঐকমত্য ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও তাঁর মিত্ররা ইরাকে হামলা চালায়। জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর এমন হামলা শুধু বেআইনিই নয়, অনৈতিকও। কিন্তু ইঙ্গ-মার্কিন মোড়লরা ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে মানবধংসী অস্ত্রভাণ্ডার আছে— ধূয়া তুলে গায়ের জোরে সেই হামলা করে। শান্তির কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করে দেশটিকে ঝাঝরা করে দেয়। দেশটির প্রায় দশ লাখ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হন। শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ে পড়ে যায় দেশটি। এরপরই দেশ ছাড়ে পশ্চিমারা।

আফগানিস্তানে তালেবানের ওপর হামলা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। ওই হামলা বা যুদ্ধে চীন ও রাশিয়া অংশ নেয়নি। জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়াই ওই দেশেও হামলা হয়।

ফিলিস্তিনের ব্যাপারেও জাতিসংঘ দ্বিমুখী আচরণ করে আসছে। ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে জাতিসংঘ চুপচাপ। ফিলিস্তিনে বারবার হামলা চালালেও জাতিসংঘ শুধু ‘দুঃখ প্রকাশ, শোক জানানো’ ধরনের বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েই দায় শোধ করে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ তকমা দিতে নিরাপত্তা পরষদে আলোচনাও হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ করলেও ইসরাইলের শাস্তি দাবি করেনি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তাঁর মিত্ররা। ফলে দেশটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ।

ফিলিস্তিনের ব্যাপারে চুপ থাকলেও সেই জাতিসংঘই ইউক্রেনের ব্যাপারে সরব। যখন রাশিয়া দেশটিতে হামলা চালালো, তখন জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রের সুরে কথা বলতে শুরু করল। ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব। এসব নিষেধাজ্ঞায় জাতিসংঘ পশ্চিমাদের পাশেই আছে। অথচ যুদ্ধ বন্ধে তাঁর জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেই।

যুদ্ধ বন্ধ করতে না পারলেও যুদ্ধে গণহত্যায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ বা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্গঠনে কিছু তৎপরতা দেখিয়ে দায় সারছে জাতিসংঘ। যুদ্ধ এলাকা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরাতেও কাজ করছে। এর বাইরে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্লিন সংকট থেকে শুরু করে হালের ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ নিন্দা, বিবৃতি প্রদান ও নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করেনি। ১৯৬২ সালে কিউবায় মিসাইল সংকট সমাধানে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে ভিয়েতনামে বা কোরীয় উপদ্বীপের যুদ্ধে জাতিসংঘের কোনো ভূমিকাই নেই। জাতিসংঘের ব্যর্থতায় নাপাম বোমার চিহ্ন এখনো বয়ে বেড়ায় ভিয়েতনামিরা।

মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ ঠেকাতে পারেনি জাতিসংঘ। এমনকি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরাতেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ। লিবিয়া বা ইরাকে সিভিলিয়ানদের রক্ষা করতে পারেনি তাঁরা। বরং গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র ধ্বংসের নামে ইরাকে, সোমালিয়ায় যুদ্ধের আয়োজন করে দিয়েছে বিশ্বসংগঠনটি। কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ একেবারেই ব্যর্থ। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময়ও সাক্ষীগোপালের ভূমিকায় ছিল সংগঠনটি। বসনিয়ার সেব্রেনিৎসায় সার্বদের গণহত্যা যখন চলে, সংগঠনটি টিনের চশমা পরে চেয়ে চেয়ে দেখেছে শুধু।

জাতিসংঘ মূলতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী শক্তির বৈশ্বিক জোট। যদিও প্রতিষ্ঠাকালে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিগ্রহ এড়িয়ে বিশ্বে শান্তি স্থাপনের জন্য এই আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থাটির যাত্রা। কিন্তু যে স্বপ্ন সংস্থাটি দেখিয়েছিল, সেটি কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে তাঁরা।

এখনো শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা, যুদ্ধ বিগ্রহ আর হানাহানির এই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সংগঠন হয়ে উঠুক বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই সংস্থাটি।

Link copied!